কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজো ঘিরে অবশেষে শুরু হল প্রস্তুতি। পুজো হবে কি না, তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। পুজো কমিটির অভ্যন্তরীণ বিবাদ এবং পরিচালনাগত জটিলতার কারণে বাগবাজারের ঐতিহাসিক দুর্গোৎসব এবার আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন উদ্যোক্তা থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় দুর্গাপুজো হিসেবে বাগবাজার সর্বজনীনের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সাবেকি প্রতিমা, ঐতিহ্যবাহী পুজোর রীতি, সাংস্কৃতিক আবহ এবং দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে কলকাতার পুজো মানচিত্রে এই পুজোর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিবছর অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে বহু মানুষ বাগবাজারে ভিড় করেন। ফলে এই পুজোকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল।
## কমিটির অভ্যন্তরীণ বিবাদে তৈরি হয়েছিল জট
বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির পরিচালনা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। কমিটির নির্বাচন এবং বিভিন্ন পদে দায়িত্ব বণ্টনকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও তীব্র হয়। একাধিক পদে ভোটাভুটি হলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে সমান ভোট পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পুজোর প্রস্তুতি শুরু করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আটকে যায়।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের জেরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। কমিটির দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ মেটাতে আইনি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। ঐতিহ্যবাহী একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই মনে করেন, ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের কারণে কোনওভাবেই পুজোর মতো জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়।
এই পরিস্থিতিতে আদালতের তরফেও বিবাদ মিটিয়ে পুজো সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব না বাড়িয়ে ঐক্যের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বার্তা দেওয়া হয়।
## শেষ পর্যন্ত শুরু প্রস্তুতি
অনিশ্চয়তার আবহ কাটিয়ে বাগবাজার সর্বজনীনে প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন উদ্যম দেখা দিয়েছে। পুজোর কাঠামো, মণ্ডপ, প্রতিমা এবং আনুষঙ্গিক কাজকর্ম ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পুজোর দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসায় হাতে সময় কম। তাই দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো সাধারণত সাবেকি ঐতিহ্য মেনেই আয়োজিত হয়। এখানে জাঁকজমকপূর্ণ থিমের পরিবর্তে প্রতিমা, পুজোর রীতি এবং পুরনো দিনের আবহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই এবারের আয়োজন করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
পুজোর প্রস্তুতি শুরু হলেও কমিটির অভ্যন্তরীণ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও আলোচনা রয়েছে। তবে পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আপাতত অনেকটাই কমেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাকি সমস্যাগুলিও দ্রুত মিটে যাবে এবং নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
## বাগবাজারের পুজোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব কলকাতার অন্যতম প্রাচীন বারোয়ারি পুজো হিসেবে পরিচিত। এই পুজোর সঙ্গে উত্তর কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় মানুষের মিলনক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
পুরনো কলকাতার পুজোর যে সাবেকিয়ানা, তা বাগবাজারে এখনও অনেকটাই বজায় রয়েছে। প্রতিমার গড়ন, পুজোর আচার, ঢাকের বাদ্যি এবং দর্শনার্থীদের ভিড়—সব মিলিয়ে এখানে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাগবাজারের পুজো দেখতে আসেন। অনেকের কাছে এই পুজো কলকাতার শারদোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই কারণেই বাগবাজারের পুজো ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটা প্রভাব ফেলেছিল। পুজো না হলে শুধু একটি কমিটির অনুষ্ঠান বন্ধ থাকত না, বরং কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও বড় ক্ষতি হত বলে মনে করছিলেন অনেকে।
## দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানোও বড় চ্যালেঞ্জ
বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী আসেন। ফলে পুজোর প্রস্তুতির পাশাপাশি নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ, অগ্নিনির্বাপণ এবং চিকিৎসা পরিষেবার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তুতি দেরিতে শুরু হওয়ায় এই কাজগুলি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে উদ্যোক্তাদের।
পুজোর দিনগুলিতে রাস্তা দিয়ে মানুষের যাতায়াত, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা, প্রবীণ ও শিশুদের নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়ে পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধা কমানো এবং দর্শনার্থীদের সুষ্ঠু দর্শনের সুযোগ করে দেওয়াও উদ্যোক্তাদের সামনে বড় দায়িত্ব।
প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুজো কমিটির অভ্যন্তরীণ বিবাদ যাতে কোনওভাবেই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রভাব না ফেলে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
## ঐতিহ্য রক্ষার আহ্বান
বাগবাজার সর্বজনীনের মতো ঐতিহ্যবাহী পুজোকে ঘিরে যে কোনও বিরোধ দ্রুত মিটিয়ে ফেলা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পুজোপ্রেমীরা। তাঁদের বক্তব্য, পুজো কমিটির পদ বা পরিচালনা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যেন দুর্গোৎসবের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
পুজো শুধু কয়েকজন উদ্যোক্তার অনুষ্ঠান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে এলাকার মানুষ, দর্শনার্থী, শিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি, আলো ও মণ্ডপশিল্পী এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক। তাই সকলের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে আয়োজন করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় কলকাতার পুজোপ্রেমীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। এখনও কিছু সাংগঠনিক জটিলতা থাকলেও পুজো আয়োজনের কাজ এগিয়ে যাওয়াই আপাতত সবচেয়ে বড় খবর। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ততার এই পুজো শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।


