দেবীপক্ষের সূচনাতেই এবার কলকাতায় হতে চলেছে নজরকাড়া আয়োজন। আগামী **১০ অক্টোবর মহালয়া** উপলক্ষে ইডেন গার্ডেন্সে হবে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে বিশেষ মেগা অনুষ্ঠান। সেখান থেকেই কার্যত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর উৎসব। আর এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি। সূত্রের খবর, শুধু উপস্থিতিই নয়, ইডেনের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মায়ের চক্ষুদানও করতে পারেন। তবে বিষয়টি এখনও সম্ভাবনার স্তরেই রয়েছে।
### মায়ের চোখ আঁকতে পারেন প্রধানমন্ত্রী
সাংবাদিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইডেনের অনুষ্ঠানে দেবী দুর্গার প্রতিমার চক্ষুদানের বিশেষ পর্ব রাখা হতে পারে। সেই পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মায়ের চোখ আঁকতে পারেন বলে জানা গিয়েছে। মহালয়ার সঙ্গে চক্ষুদানের বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগ রয়েছে। তাই দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে এই পর্বকে অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী আদৌ সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না, এবং চক্ষুদান করবেন কি না—তা চূড়ান্ত কর্মসূচি প্রকাশের পরই নিশ্চিত হবে। এর আগে রাজ্য সরকারের তরফে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে মহালয়ার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
### রেড রোডে বর্ণময় শোভাযাত্রা
ইডেনের মেগা অনুষ্ঠানের আগে কলকাতার রেড রোডেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আলোকসজ্জায় সেজে ওঠা রেড রোড ধরে পুজোর শোভাযাত্রা বের হবে। সেখানে বাংলার **২৩টি জেলার ২৩ ধরনের নৃত্য ও লোকসংস্কৃতি** তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কলকাতার দুর্গাপুজো নয়, গোটা বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকেই সামনে আনা হবে।
দার্জিলিঙের তামাং সেলো, কালিম্পঙের লেপচা নাচ থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী লোকনৃত্য—বিভিন্ন জেলার নিজস্ব সংস্কৃতি এই অনুষ্ঠানে জায়গা পাবে বলে জানা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মালদহের গম্ভীরা, বীরভূমের বাউল, বর্ধমানের রাইবেশে, সাঁওতালি নাচ এবং পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার ছৌ-ও থাকছে অনুষ্ঠানের তালিকায়।
### বাংলার লোকসংস্কৃতির মহামিলন
ইডেনের অনুষ্ঠানে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের লোকশিল্পকে এক মঞ্চে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদিয়ার গৌড়ীয় বৈষ্ণব নাচ, পূর্ব মেদিনীপুরের পটুয়ার গান, হুগলির রামপ্রসাদী, হাওড়ার লোকনাট্য এবং উত্তর ২৪ পরগনার বনবিবি পালার মতো আঞ্চলিক শিল্পধারাও অনুষ্ঠানের অংশ হতে পারে।
ঝাড়গ্রাম-সহ জঙ্গলমহলের লোকসংস্কৃতিও তুলে ধরা হবে। ফলে এই অনুষ্ঠানকে শুধুমাত্র দুর্গাপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান না রেখে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
### ১০ হাজার পুজোর একসঙ্গে উদ্বোধন?
ইডেনের অনুষ্ঠানকে আরও বড় আকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় **১০ হাজার দুর্গাপুজোর উদ্বোধন** প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কলকাতার একটি মঞ্চ থেকেই গোটা বাংলার পুজোর সূচনার বার্তা দেওয়ার ভাবনা রয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দুর্গাপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হিসেবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রথমবার বিজেপি সরকারের আমলে এমন বড় আকারের মহালয়া অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
### ‘মা আসছে—উমা স্টোরি’ থিমে বিশেষ শো
ইডেনের অনুষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহারেও থাকছে চমক। পরিকল্পনা অনুযায়ী, **‘মা আসছে—উমা স্টোরি’** থিমে থ্রি-ডি প্রোজেকশন ম্যাপিং শো আয়োজন করা হবে। আলো, শব্দ এবং ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে দেবী দুর্গার আগমন ও বাংলার পুজোর আবহকে তুলে ধরা হবে।
এর পাশাপাশি আকাশে ড্রোন শোয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে ইডেন গার্ডেন্সের আকাশ এবং মাঠ—দুই জায়গাতেই দর্শকদের জন্য বড়সড় ভিজ্যুয়াল আয়োজন দেখা যেতে পারে।
### কেন মহালয়ার দিনকে বেছে নেওয়া হয়েছে?
মহালয়া বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় তিথি নয়, শারদোৎসবের আবেগের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। ভোরে চণ্ডীপাঠ, তর্পণ এবং দেবীর আগমনী বার্তার মধ্য দিয়ে বাঙালির মনে দুর্গাপুজোর আবহ তৈরি হয়।
প্রতিমার চক্ষুদানও মহালয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রচলিত রীতি। বহু জায়গায় এই দিন প্রতিমার চোখ আঁকার প্রথা রয়েছে। তাই ইডেনের মেগা অনুষ্ঠানে চক্ষুদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার পিছনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক—দুই ধরনের তাৎপর্যই রয়েছে।
### বিশ্বের দরবারে বাংলার পুজো তুলে ধরার লক্ষ্য
কলকাতার দুর্গাপুজো ২০২১ সালে UNESCO-র **Intangible Cultural Heritage of Humanity** তালিকায় জায়গা করে নেয়। সেই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগিয়ে কলকাতা ও বাংলাকে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারের পরিকল্পনায় তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার লোকসংস্কৃতি, শিল্প, নৃত্য, সংগীত এবং দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
### ইডেন ঘিরে বাড়ছে প্রস্তুতি
ইডেন গার্ডেন্সকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, **২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত** ইডেনের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় থাকার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানের ব্লু-প্রিন্টও প্রায় চূড়ান্ত বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও শেষ মুহূর্তে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
এর আগে আরও রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, মহালয়ার দিন ইডেনে একটি মেগা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
### রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম বড় পুজো আয়োজন
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের আমলে এটাই প্রথম দুর্গাপুজো। ফলে মহালয়ার ইডেন অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে অনুষ্ঠানের মূল বার্তা যে বাংলার দুর্গাপুজো ও সংস্কৃতিকে সামনে আনা—সেটিই সরকারি পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও অনুষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে **১০ অক্টোবর মহালয়ার সন্ধ্যায় ইডেন গার্ডেন্স** যে এবার দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র হতে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মেগা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ২৩ জেলার লোকশিল্প, রেড রোডের শোভাযাত্রা, ড্রোন শো এবং চক্ষুদানের সম্ভাব্য পর্ব—সব মিলিয়ে কলকাতায় দেবীপক্ষের সূচনাই এবার হয়ে উঠতে পারে এক মহা-উৎসব। আর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সত্যিই মায়ের চোখ আঁকেন কি না, সেই উত্তর মিলবে চূড়ান্ত অনুষ্ঠানের দিন।


