৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শুক্রবার সন্ধ্যায় দেওয়া এই ভাষণে দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্য—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় ‘অপারেশন সিঁদুর’। পাশাপাশি প্রশ্নফাঁসের মতো সমস্যা মোকাবিলা, নকশালমুক্ত ভারত গড়ার অগ্রগতি, ডিজিটাল লেনদেনে ভারতের সাফল্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
স্বাধীনতা দিবসের আগের সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির জাতির উদ্দেশে ভাষণ ভারতের সাংবিধানিক রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা থেকে আকাশবাণী ও দূরদর্শনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্প্রচার করা হয়। হিন্দির পর ইংরেজি ভাষায় বক্তব্য সম্প্রচারিত হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাতেও তা প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। এবার ভাষণটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ ২০২৬ সালে ভারত স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার এতগুলি বছর পর ভারত যে জায়গায় পৌঁছেছে, তার পিছনে রয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রম। কৃষক, শ্রমিক, বিজ্ঞানী, সেনা, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, যুবসমাজ এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের অবদান ভারতের অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি বলে তিনি তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে বিশেষভাবে উঠে আসে ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের অবস্থান যে কঠোর, তা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, যারা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাবে, তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না।
‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর ভারতের সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত এই অভিযানে পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে থাকা জঙ্গি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি এই অভিযানের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তি এবং দক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া দেশের সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে তিনি জাতীয় স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে দেশের কৃষকদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন তিনি। অর্থাৎ নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ—দুই ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তাই রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে এসেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে নকশাল সমস্যায় আক্রান্ত বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি এবং ভারতকে নকশালমুক্ত করার প্রচেষ্টার বিষয়টি তাঁর ভাষণে উঠে আসে। নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়নকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির তুলনায় ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। এর ফলে ভারতের উন্নয়নযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য নিয়েও রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। সেই সময়ের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তার জন্য বর্তমান প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করিয়ে দেন। উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়, প্রযুক্তি এবং সুযোগের সমান অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
ডিজিটাল ভারত নিয়েও রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে আশাবাদের সুর ছিল। রিয়েল-টাইম ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্বব্যাপী এই ধরনের লেনদেনের একটি বড় অংশ ভারতের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। ডিজিটাল পরিকাঠামো কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করছে এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করছে, সেই দিকটিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও রাষ্ট্রপতির ভাষণে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাওয়া যায়। প্রশ্নফাঁসের মতো সমস্যা দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই নিয়োগ পরীক্ষা ও শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পাওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের পরিশ্রমের মর্যাদা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে আসে। এই বিষয়টি বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ।
ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়েও রাষ্ট্রপতি সরব হন। দেশের কোনও নাগরিক যেন আর্থিক অসুবিধার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত ও সমানভাবে বিচার পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বিচারব্যবস্থাকে আরও নাগরিকবান্ধব করার বার্তা দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে ভারতের বহুত্ববাদ ও ঐক্যের কথাও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও ভারতীয়দের একসূত্রে আবদ্ধ রাখার শক্তি হিসেবে সংবিধান ও জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেন। স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তির মুহূর্তে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বানও তাঁর বক্তব্যের সামগ্রিক সুরে প্রতিফলিত হয়েছে।
এবারের ভাষণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মনির্ভরতার বার্তা। প্রতিরক্ষা থেকে প্রযুক্তি, উৎপাদন থেকে ডিজিটাল পরিষেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ শুধু একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গেও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা সেই আত্মনির্ভরতার একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালের ভাষণে অতীতের আত্মত্যাগের স্মরণ, বর্তমান ভারতের সাফল্য এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের লক্ষ্য—তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে উঠে এসেছে। একদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি; পাশাপাশি ন্যায়বিচার, স্বচ্ছ শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ২০৪৭ সালের বিকশিত ভারতের স্বপ্ন—রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের একটি বিস্তৃত ছবি ফুটে উঠেছে।
স্বাধীনতার ৮০ বছরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ তাই শুধু দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়। বরং জাতীয় নিরাপত্তা থেকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি থেকে সামাজিক ন্যায়—আগামী দিনের ভারতের জন্য একাধিক অগ্রাধিকারের কথাই এতে স্পষ্ট হয়েছে। দেশের অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্বের কথাও উঠে এসেছে। স্বাধীনতার শতবর্ষে একটি আরও শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।


