ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনার আবহেই সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। জেদ্দায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা যৌথ চুক্তি’। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের মধ্যে কোনও একটি দেশের উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহযোগিতা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে বিস্তারিত কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই চুক্তি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ফের সামরিক সংঘাত তৈরি হলে ইসলামাবাদের পাশে কি সৌদি আরব এবং তুরস্ক দাঁড়াবে? বিশেষ করে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো কোনও অভিযান আবার হলে নতুন এই প্রতিরক্ষা সমঝোতার বাস্তব প্রভাব কতটা হতে পারে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে আলোচনা।
তবে এই মুহূর্তে এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই যে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ক্ষেত্রে সৌদি আরব বা তুরস্ক সরাসরি পাকিস্তানের হয়ে সামরিক যুদ্ধে নামবে। চুক্তির ভাষাতেও কোনও নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে সামরিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে সম্ভাবনা এবং বাস্তব প্রতিশ্রুতির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
### কী বলা হয়েছে মক্কা যৌথ চুক্তিতে?
নতুন চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তিন দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্কের কোনও একটি দেশের উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মহম্মদ বিন সলমন এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান। তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য।
তবে এই চুক্তির অধীনে কোনও দেশ আক্রান্ত হলে অপর দুই দেশ ঠিক কী ধরনের সাহায্য করবে—সেনা পাঠানো, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া নাকি কূটনৈতিক সহযোগিতা—তা স্পষ্ট করা হয়নি।
### অপারেশন সিঁদুরের পর নতুন সমীকরণ
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সঙ্গে এই চুক্তির সময়কালকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে এবং পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে একাধিক জঙ্গি পরিকাঠামোয় হামলা চালানোর কথা জানায়।
এরপর পাকিস্তানের পাল্টা হামলা এবং ভারতের জবাবের মধ্যে কয়েক দিন ধরে সামরিক উত্তেজনা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত দুই দেশ সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হলে কী হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব-পাকিস্তান-তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে।
### পাকিস্তানের পাশে কি সৌদি আরব থাকবে?
নতুন চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ সৌদি আরব। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চুক্তিটি কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে বলে সৌদি আরব বা অন্য কোনও পক্ষ ঘোষণা করেনি। ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ক্ষেত্রে সৌদি আরব সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক সহযোগী হবে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো ঠিক হবে না।
বরং চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিই আপাতত মূল বিষয়।
### তুরস্কের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহুদিনের। ফলে নতুন চুক্তিতে তুরস্কের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
অপারেশন সিঁদুরের পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে তুরস্কের অবস্থানও আলোচনায় ছিল। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে তুরস্কের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তি কোনও নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি। আঙ্কারার বক্তব্য অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করাই এর লক্ষ্য।
### ইরানের প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ
নতুন চুক্তি নিয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়েছে। চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর তেহরানের পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে সতর্ক করা হয়েছে যে শুধুমাত্র কাগজে স্বাক্ষর করা কোনও প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের ধরনও আলাদা।
ফলে নতুন চুক্তিকে শুধুমাত্র ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বৃহত্তর পশ্চিম এশীয় সমীকরণটি বাদ পড়ে যায়।
### ‘সুন্নি ন্যাটো’ কি তৈরি হচ্ছে?
নতুন চুক্তি প্রকাশ্যে আসার পর কোনও কোনও মহলে এটিকে ‘সুন্নি ন্যাটো’-র সম্ভাব্য সূচনা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে আসায় এমন আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে ‘সুন্নি ন্যাটো’ নামে কোনও সামরিক জোটের কথা বলা হয়নি। তাই এই ধরনের ব্যাখ্যাকে আপাতত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবেই দেখা উচিত।
চুক্তিটির প্রকৃত পরিধি এবং বাস্তবে তিন দেশ কীভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করবে, তা সময়ের সঙ্গে আরও পরিষ্কার হতে পারে।
### ভারত কী বলছে?
নতুন চুক্তি নিয়ে ভারতও নজর রাখছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি বিষয়টির উপর নজর রাখছে। তবে চুক্তি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে এখনও কোনও বিস্তারিত সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, নতুন এই সমঝোতা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে।
যদিও শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনও সম্ভাব্য সংঘাতের ফলাফল নির্ধারণ করে না। একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক শক্তি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং সংঘাতের প্রকৃতি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
### ভবিষ্যতে সংঘাত হলে কী হতে পারে?
যদি ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আবার সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন মক্কা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।
পাকিস্তান যদি মনে করে যে তারা চুক্তির আওতায় সৌদি আরব বা তুরস্কের নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইতে পারে, তাহলে সেই সহযোগিতার ধরন কী হবে, সেটিই হবে মূল প্রশ্ন।
তা সরাসরি সামরিক সহায়তা হতে পারে, আবার কূটনৈতিক উদ্যোগ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা অন্য কোনও ধরনের সহায়তাও হতে পারে। কিন্তু বর্তমান চুক্তিতে নির্দিষ্ট করে কোনও একটি পদ্ধতির কথা বলা হয়নি।
### পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক গুরুত্ব
এই চুক্তি পাকিস্তানের জন্য শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো দুই প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা পাকিস্তানের আঞ্চলিক কূটনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের জন্যও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং তুরস্কের সঙ্গে সমন্বয় বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হতে পারে।
তবে এই চুক্তি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ক্ষেত্রে কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ চুক্তি দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চুক্তিতে তিন দেশের কোনও একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে কী ধরনের সামরিক বা প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাই ভবিষ্যতে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সৌদি আরব বা তুরস্ক সরাসরি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধে নামবে—এমন দাবি করার মতো নির্দিষ্ট ভিত্তি এখনও নেই। তবে তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ার ফলে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণে এর প্রভাব পড়তে পারে। ভারতও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। আগামী দিনে এই চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এবং তিন দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার পরিধিই নির্ধারণ করবে, পাকিস্তানের জন্য এর প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব কতটা।


