স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) অজিত ডোভালের বক্তব্যে উঠে এল ভারতের নিরাপত্তা নীতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর প্রথমবারের মতো দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে ডোভাল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভারতের উদারতা ও সহনশীলতাকে কোনওভাবেই দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারত কঠোর পদক্ষেপ নিতে এবং বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
অজিত ডোভালের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ‘ডিক্লাসিফায়েড: অপারেশন সিঁদুর’ নামে একটি তথ্যচিত্র সিরিজ সম্প্রচারের প্রস্তুতি চলছে। এই তথ্যচিত্রে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং অভিযানের সঙ্গে যুক্ত সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা নেতৃত্বের ভূমিকা তুলে ধরা হবে। আগামী ১৫ আগস্ট রাত ৯টায় ডিসকভারি চ্যানেলে তথ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার হওয়ার কথা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ডোভাল ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি এবং সভ্যতাগত বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গও সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হল, ভারত ঐতিহাসিকভাবে সহনশীল এবং উদার হলেও সেই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ভুল। ভারতের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে কেউ যদি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে দেশের নিরাপত্তার উপর আঘাত হানে, সেক্ষেত্রে পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা এবং ইচ্ছা দুটিই ভারতের রয়েছে।
ডোভালের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা। তিনি স্পষ্ট করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োজন হলে ভারত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থেকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। অর্থাৎ কোনও হুমকির মুখে শুধুমাত্র সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা ভেবে পিছিয়ে যাওয়ার নীতি ভারত অনুসরণ করবে না—এই বার্তাই তাঁর বক্তব্য থেকে পাওয়া যাচ্ছে।
এই বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের একাধিক জঙ্গি ঘাঁটিতে সামরিক অভিযান চালায়। ৬ ও ৭ মে-র মধ্যরাতে শুরু হওয়া এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল পহেলগাঁও হামলার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গি অবকাঠামো ধ্বংস করা। পরবর্তী কয়েকদিন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা চলে। প্রায় ৮৮ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘাতের পর ১০ মে যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ডোভাল জানিয়েছেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে সব শিবিরকে পহেলগাঁও হামলার সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলিই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। অর্থাৎ ভারতের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রেক্ষাপটে ডোভালের এই বক্তব্য ভারতের পরিবর্তিত নিরাপত্তা নীতির দিকটিও সামনে আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারত যে আরও সক্রিয় ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে, তাঁর মন্তব্যে সেই নীতিরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ভবিষ্যতে কোনও বড় নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিলে ভারত পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠোর জবাব দেওয়ার বিকল্প খোলা রাখবে।
ডোভাল একইসঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক চরিত্রের কথাও তুলে ধরেছেন। ভারত কখনও অন্য দেশের ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেনি—এই বৃহত্তর ধারণার সঙ্গে দেশের সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত। কিন্তু সেই সহনশীলতার অর্থ এই নয় যে ভারত নিজের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করবে। বরং শান্তিপূর্ণ অবস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজনের সময়ে শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতাও একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ—তাঁর বক্তব্যে সেই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নতুন তথ্যচিত্রে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কথা রয়েছে। ফলে ডোভালের সাক্ষাৎকারকে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে না দেখে অভিযানের নেপথ্যে থাকা কৌশলগত সিদ্ধান্ত বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এর আগে চলতি মাসেই তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে ডোভাল স্বাধীনতার অর্থ নিয়েও বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতাকে শুধু নিজের ইচ্ছেমতো কিছু করার স্বাধীনতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। দেশের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও স্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
সেই বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর মন্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ভারতের গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ চরিত্র, অন্যদিকে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় কঠোরতা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বার্তাই ডোভালের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সহনশীলতা ভারতের শক্তির একটি অংশ; কিন্তু সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার কোনও সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞ মহলে ডোভালের বক্তব্যকে ভারতের ‘deterrence’ বা প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। কোনও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে আগেই বোঝানো যে আক্রমণ বা সন্ত্রাসের জবাব কঠোর হতে পারে—এই কৌশল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ডোভালের বক্তব্য সেই প্রতিরোধমূলক বার্তাকেই আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে অজিত ডোভালের বক্তব্যে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। ভারতের উদারতা, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখার জন্য তাঁর সতর্কবার্তা একইসঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রয়োজন হলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা ভারতের রয়েছে—‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রসঙ্গ টেনে সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।


