টাটা গোষ্ঠীর (Tata Group) হোল্ডিং সংস্থা **টাটা সন্স (Tata Sons)**-কে নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য প্রকাশিত **আপার লেয়ার নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানি (NBFC-UL)**-এর তালিকায় টাটা সন্সকে বহাল রেখেছে। তবে একই সঙ্গে আরবিআই জানিয়েছে, সংস্থার **কোর ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (CIC)** হিসেবে নিবন্ধন প্রত্যাহারের আবেদন এখনও পর্যালোচনাধীন রয়েছে। ফলে টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ তালিকাভুক্তি (IPO) নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নতুন তালিকা অনুযায়ী, টাটা সন্স-সহ মোট ১৭টি বড় এনবিএফসি আপার লেয়ার শ্রেণিতে রয়েছে। এই শ্রেণির সংস্থাগুলির উপর সাধারণ এনবিএফসির তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রক নজরদারি, কঠোর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্সের নিয়ম প্রযোজ্য হয়। আরবিআই সম্প্রতি সম্পদের আকারের ভিত্তিতে আপার লেয়ার এনবিএফসি চিহ্নিত করার নতুন কাঠামো কার্যকর করেছে, যেখানে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকা সংস্থাগুলি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
টাটা সন্স দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়ন্ত্রক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সংস্থাটি প্রায় দুই বছর আগে আরবিআইয়ের কাছে তাদের এনবিএফসি-সিআইসি নিবন্ধন প্রত্যাহারের আবেদন করে। পাশাপাশি সংস্থা তাদের ঋণের বড় অংশ পরিশোধ করে নিজেকে ঋণমুক্ত করার উদ্যোগও নিয়েছিল। এর ফলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, নিবন্ধন প্রত্যাহার হলে টাটা সন্সকে হয়তো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে না। তবে সেই আবেদন এখনও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
আরবিআই এবার স্পষ্ট করেছে, টাটা সন্সকে আপার লেয়ার তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত তাদের নিবন্ধন প্রত্যাহারের আবেদনের ফলাফলের উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। অর্থাৎ আবেদন এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেই বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মন্তব্যের ফলে সংস্থার আইনি ও নিয়ন্ত্রক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপার লেয়ার এনবিএফসি হিসেবে থাকা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। তবে টাটা সন্সের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে আরবিআই তাদের ডি-রেজিস্ট্রেশন আবেদন গ্রহণ করে কি না, তার উপর। আবেদন অনুমোদিত হলে সংস্থার তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা এড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
টাটা সন্স ভারতের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি হোল্ডিং কোম্পানি। সংস্থাটির অধীনে টাটা স্টিল, টাটা মোটরস, টিসিএস, টাটা পাওয়ার, টাইটান-সহ একাধিক বড় কোম্পানি পরিচালিত হয়। বর্তমানে সংস্থার অধিকাংশ শেয়ারের মালিক **টাটা ট্রাস্টস**, যারা দীর্ঘদিন ধরেই টাটা সন্সকে তালিকাভুক্ত না করার পক্ষপাতী। অন্যদিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠী অতীতে তালিকাভুক্তির পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। ফলে এই বিষয়টি কর্পোরেট মহলেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবিআইয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের ফলে টাটা সন্সের উপর নিয়ন্ত্রক নজরদারি আগের মতোই বহাল থাকছে। একই সঙ্গে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কাঠামো, তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা এবং কর্পোরেট শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও জোরদার হবে। তবে আরবিআই নিবন্ধন প্রত্যাহারের আবেদন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অতএব, আপাতত টাটা সন্স আগের মতোই আপার লেয়ার এনবিএফসি হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবে। কিন্তু ডি-রেজিস্ট্রেশন আবেদন নিয়ে আরবিআইয়ের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তই ঠিক করবে ভারতের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি কোম্পানিটির পরবর্তী পথচলা এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জল্পনার পরিণতি কী হবে।


