মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করেছে। এর জেরে ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও ইতিবাচক বার্তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিম্নমুখী থাকে এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হয়, তাহলে আগামী দিনে দেশে পেট্রোল, ডিজেল এবং এলপিজির দামে স্বস্তি মিলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং তেল সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একসময় ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলেরও উপরে পৌঁছে যায়। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে চাপ কমেছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত নেমে প্রায় ৮৩ ডলার প্রতি ব্যারেলের কাছাকাছি এসেছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের জ্বালানি ব্যয়ের উপর প্রভাব ফেলে। তেলের দাম কমলে সরকারের আমদানি ব্যয়ও কমতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে খুচরো জ্বালানির দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেই সঙ্গে সঙ্গে ভারতে পেট্রোল বা ডিজেলের দাম কমে যায় না। কারণ খুচরো জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম ছাড়াও শোধন ব্যয়, পরিবহণ খরচ, কর, বিনিময় হার এবং তেল বিপণন সংস্থার মূল্য নির্ধারণ নীতির মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হয়। তাই দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এলপিজির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি প্রযোজ্য। ভারতের গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের একটি বড় অংশ আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি ও অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে ভবিষ্যতে রান্নার গ্যাসের দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও সরকারি মূল্যনীতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম কমলে শুধু সাধারণ মানুষের খরচই কমে না, পরিবহণ ব্যয়ও হ্রাস পায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্য, শিল্পপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামেও। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জ্বালানির দাম কমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের আমদানি বিল কমলে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। সামান্য উত্তেজনাও আবার আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ফলে বর্তমান মূল্যপতন স্থায়ী হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী কয়েকদিনের কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার উপর।
ভারতের জ্বালানি বাজারের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি আগামী দিনেও নিম্নমুখী থাকে, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ পেট্রোল, ডিজেল ও এলপিজির দামে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে সরকার বা তেল বিপণন সংস্থার পক্ষ থেকে মূল্য হ্রাসের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।


