মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত ফের ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। মার্কিন সেনার দাবি, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা **IRGC**-এর তরফে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পালটা পদক্ষেপ হিসেবে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করেছে আমেরিকা। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ফলে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
### কেন পাঁচ ইরানি ট্যাঙ্কারে হামলা আমেরিকার?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা **CENTCOM** জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী একটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরই ইরানের তেল পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলিকে টার্গেট করা হয়। মার্কিন বক্তব্য অনুযায়ী, ওই পাঁচটি ট্যাঙ্কার এমন একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা ইরানি সরকার, IRGC এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের অর্থ জোগাতে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে ওয়াশিংটনের অভিযোগ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগে সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলির ক্রুদের জাহাজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর মার্কিন বাহিনী জাহাজগুলিকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলায় কোনও মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
### কোন কোন ট্যাঙ্কার হামলার শিকার?
মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া পাঁচটি জাহাজের মধ্যে ছিল **Kivik, Charminar, Horizon 1, Riesco এবং Derya**। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহাজগুলির কয়েকটি খার্গ দ্বীপের আশপাশে এবং অন্যগুলি ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর সংলগ্ন অঞ্চলে ছিল।
হরমুজ প্রণালীর কাছে এই ধরনের হামলার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণপথ হিসেবে এই জলপথের উপর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল।
### জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা
মার্কিন হামলার পর ইরানও অপেক্ষা করেনি। **জর্ডানের আল-আজরাক এলাকায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি** লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে IRGC। ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে মার্কিন তেল ট্যাঙ্কারে হামলার জবাব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে আটকানো হয়। Reuters-এর প্রতিবেদনে জর্ডানের পক্ষ থেকে ২০টির মধ্যে ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা বলা হয়েছে। বাকি ক্ষেপণাস্ত্রগুলির কয়েকটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে বলে জানানো হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
### ‘বড় ক্ষতি’, ইরানের দাবি কতটা সত্য?
ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মার্কিন ও জর্ডানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছিল এবং মার্কিন সেনাদের মধ্যে কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তাই ইরানের তরফে দাবি করা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
অর্থাৎ, দু’পক্ষই নিজেদের সামরিক সাফল্য তুলে ধরছে। সংঘাতের এমন পরিস্থিতিতে সরকারি বিবৃতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে বলেই নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
### শুধু জর্ডান নয়, হরমুজেও উত্তেজনা
ইরানের পালটা অভিযানের পর উত্তেজনা ছড়িয়েছে **হরমুজ প্রণালীতে**। Reuters জানিয়েছে, ইরান একাধিক জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বহু বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সেখানে সামরিক সংঘর্ষ বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
### তেলের দামে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
মার্কিন-ইরান সংঘাতের নতুন পর্যায়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলির একটি হল আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। Financial Times-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি প্রায় **১০০ ডলারের কাছাকাছি** চলে গিয়েছে।
কারণ, ইরানের তেল রপ্তানি এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললে পরিবহণ খরচ, জ্বালানির দাম এবং তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পণ্যের দামের উপর পড়তে পারে।
### কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘাতের দ্রুত বিস্তার
এই হামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক দিন ধরেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পালটা হামলা চলছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মার্কিন বাহিনী ইরানি তেল ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছিল। তার পরেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক সম্পদকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে।
সাম্প্রতিক পাঁচ ট্যাঙ্কার ধ্বংস এবং জর্ডানের ঘাঁটিতে ইরানের হামলা সেই সংঘাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
### নতুন নিষেধাজ্ঞাও আমেরিকার
সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সংস্থা ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৩৬টি সংস্থা ও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিমান সংস্থা এবং Mahan Air-এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে।
অর্থাৎ, তেহরানের উপর চাপ তৈরি করতে আমেরিকা একইসঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই পথেই এগোচ্ছে।
### হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের জ্বালানি বাজারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—হরমুজ প্রণালী কতটা নিরাপদ থাকবে?
ইরান এর আগে হরমুজের নির্দিষ্ট অংশে নিষেধাজ্ঞামূলক এলাকা তৈরির হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য নিজেদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
যদি বাণিজ্যিক জাহাজগুলি ওই জলপথ ব্যবহার করতে ভয় পায় অথবা সামরিক সংঘর্ষের কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
### সংঘাত কি আরও বড় যুদ্ধে পরিণত হবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হল সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার। ইরান ইতিমধ্যেই জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেছে। একইসঙ্গে উপসাগরীয় জলপথে জাহাজকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। এর ফলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলিও সরাসরি সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই এখন মূল প্রশ্ন—দুই দেশ কি পালটা হামলার এই চক্র থামাবে, নাকি সামরিক অভিযান আরও বাড়বে? প্রতিটি নতুন হামলার পর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়ছে।
### সাধারণ মানুষের জন্যও বড় উদ্বেগ
আমেরিকা ও ইরানের সামরিক সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে এই সংঘাত সরাসরি যুক্ত। ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব জ্বালানি, পরিবহণ এবং আমদানি-রপ্তানির উপর পড়তে পারে।
বিশেষ করে ভারতসহ এশিয়ার তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলির জন্য হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগামী কয়েক দিনে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে গোটা বিশ্বের।
সব মিলিয়ে, **পাঁচ ইরানি তেল ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলার পর জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা** মধ্যপ্রাচ্যের চলতি সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। আপাতত দু’পক্ষই নিজেদের পদক্ষেপকে প্রতিরক্ষামূলক বা প্রতিশোধমূলক বলে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু হামলা-পালটা হামলার এই ধারা যদি চলতেই থাকে, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা আসতে পারে।


