বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু পর্তুগালের জাতীয় দলের মুখই নন, গোটা দেশের ক্রীড়া পরিচয়ের অন্যতম বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই পর্তুগালের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রোনাল্ডোর বিদায় শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে নয়, দেশের ফুটবল অর্থনীতি, স্পনসরশিপ, দর্শক আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিপণন বিশেষজ্ঞদের দাবি, রোনাল্ডো আজ শুধুমাত্র একজন ফুটবলার নন। তিনি নিজেই একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। তাঁর উপস্থিতি পর্তুগালের জাতীয় দলকে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পর্তুগালের ম্যাচ মানেই বিপুল দর্শক, টিভি রেটিং বৃদ্ধি এবং স্পনসরদের আগ্রহ। ফলে রোনাল্ডো অবসর নিলে সেই জনপ্রিয়তার বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন যদি এখন থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা না করে, তাহলে বাণিজ্যিক দিক থেকে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। স্পনসরদের বিনিয়োগ কমে যাওয়া, জার্সি বিক্রিতে প্রভাব, আন্তর্জাতিক প্রচারে ভাটা এবং সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য কমে যাওয়ার মতো একাধিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ব্র্যান্ড এখনও রোনাল্ডোকেই কেন্দ্র করে নিজেদের প্রচার কৌশল সাজায়।
রোনাল্ডোর অবদান অবশ্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়। মাঠের পারফরম্যান্সেও তিনি পর্তুগালের ইতিহাসে অনন্য। দেশের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বাধিক গোল করার রেকর্ড তাঁর দখলে। ইউরো ২০১৬ জয় এবং উয়েফা নেশনস লিগ জয়ে তাঁর নেতৃত্ব পর্তুগালকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তরুণ ফুটবলারদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক।
তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, কোনও দেশ দীর্ঘদিন একজন তারকার উপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সামনে নিয়ে আসা, তাদের ঘিরে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করা এবং দলগত শক্তিকে আরও মজবুত করাই হবে পর্তুগালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, গনসালো রামোস, রাফায়েল লিয়াওদের মতো ফুটবলারদের ঘিরে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে।
২০২৬ বিশ্বকাপের পর রোনাল্ডো জানিয়েছেন, এটিই ছিল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। যদিও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি। ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে তাঁর জাতীয় দলের জার্সিতে আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনও জল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, পর্তুগালের ফুটবল মহলে এখন থেকেই রোনাল্ডো-পরবর্তী যুগের প্রস্তুতি শুরু করার দাবি উঠছে। শুধু একজন তারকার বিকল্প খুঁজে পেলেই হবে না, বরং গোটা ফুটবল কাঠামোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে দলগত সাফল্যই প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি তরুণ প্রতিভা তৈরির উপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোনাল্ডোর জনপ্রিয়তা আগামী বহু বছর অটুট থাকবে বলেই মনে করেন ক্রীড়া বিপণন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু মাঠ থেকে তাঁর বিদায়ের পর পর্তুগালকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। সেই পরিবর্তনের জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ও ক্রীড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশটির ফুটবল।


