কলকাতার ঐতিহ্যবাহী **কলেজ স্ট্রিট**—যা ‘বইপাড়া’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত—তাকে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা সামনে আনলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী **অগ্নিমিত্রা পাল**। সম্প্রতি কলেজ স্ট্রিট এলাকা পরিদর্শনের পর তিনি জানান, লন্ডনের বিখ্যাত **অক্সফোর্ড স্ট্রিট**-এর আদলে এই ঐতিহাসিক এলাকাকে আধুনিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এলাকার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই পরিকাঠামো উন্নয়ন করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যায়ন নয়, বরং কলেজ স্ট্রিটকে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিণত করা যেখানে বইপ্রেমী, গবেষক, ছাত্রছাত্রী এবং পর্যটকরা আরও আরামদায়ক পরিবেশে সময় কাটাতে পারবেন। তাঁর মতে, ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্মকে আবার বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে এমন একটি আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলেজ স্ট্রিটের একটি বড় অংশকে **যানবাহনমুক্ত (No-Vehicle Zone)** হিসেবে গড়ে তোলা হতে পারে। ফলে সেখানে হর্নের শব্দ ও যানজট কমবে। পথচারীরা নিশ্চিন্তে বইয়ের দোকান ঘুরে দেখতে পারবেন এবং এলাকার সামগ্রিক পরিবেশও আরও মনোরম হয়ে উঠবে। প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সুবিধার জন্য ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবস্থা রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে।
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বইয়ের দোকানগুলিকে একটি অভিন্ন নান্দনিকতার আওতায় আনা। দোকানের বাইরের অংশ, সাইনবোর্ড এবং সামগ্রিক সাজসজ্জায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ধাঁচের ল্যাম্পপোস্ট, বসার বেঞ্চ, পথচারী-বান্ধব ফুটপাত এবং বিনামূল্যে **Wi-Fi** পরিষেবার মতো সুবিধাও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া কলকাতার ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক **ট্রাম** পরিষেবাকে নতুনভাবে ব্যবহার করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ নকশার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম এই এলাকায় চলতে পারে, যা পর্যটকদের কাছে অতিরিক্ত আকর্ষণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে সাইকেল স্ট্যান্ড এবং ভাড়ায় সাইকেল পরিষেবার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে, যাতে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত উৎসাহিত হয়।
সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার কমিশনার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কলেজ স্ট্রিট বাজার পরিদর্শন করে এলাকার বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখেছেন। বর্ষার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো, ছাদ থেকে জল পড়া, ভাঙাচোরা অংশ, পরিচ্ছন্নতা এবং অবৈধ দখলের মতো বিভিন্ন সমস্যাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুনে দ্রুত উন্নয়নের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলেজ স্ট্রিট শুধু একটি বাজার নয়, এটি বাংলা সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি এর ঐতিহ্য সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে কলেজ স্ট্রিট আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এর সুফল পাবেন।
তবে এখনও এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা, ব্যয় এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট দফতরকে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ধাপে ধাপে কাজ শুরু হতে পার |
সব মিলিয়ে, কলেজ স্ট্রিটকে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে আধুনিক রূপ দেওয়ার এই পরিকল্পনা সফল হলে কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এলাকাটি নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বই, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনার সমন্বয়ে এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের একটি সাংস্কৃতিক গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


