দুর্গাপুজোর আবহে এবার বইয়ের স্টল ঘিরে নতুন কৌশল নিয়েছে সিপিএম। প্রতি বছরের মতো মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন কিংবা বিপ্লবী সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে এবার **স্বামী বিবেকানন্দ, গৌতম বুদ্ধ এবং আদি শঙ্করাচার্যের রচনাও** রাখা হবে দলের বিভিন্ন বইয়ের স্টলে। দলীয় নেতৃত্বের দাবি, এটি কোনও আদর্শগত পরিবর্তন নয়; বরং বিভিন্ন মত, দর্শন ও চিন্তার সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
### পুজোর স্টলে নতুন সংযোজন
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় দুর্গাপুজো উপলক্ষে প্রতিবছর সিপিএমের পক্ষ থেকে বইয়ের স্টল খোলা হয়। সেখানে সাধারণত বামপন্থী রাজনৈতিক সাহিত্য, ইতিহাস, অর্থনীতি, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন এবং সমাজতাত্ত্বিক বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও বিভিন্ন প্রকাশনা রাখা হয়।
তবে এবারের বিশেষত্ব হল, মার্কসবাদী সাহিত্য ছাড়াও ভারতীয় দর্শনের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব—**স্বামী বিবেকানন্দ, গৌতম বুদ্ধ এবং আদি শঙ্করাচার্যের বই**ও স্টলে স্থান পাবে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন বয়সের পাঠকের আগ্রহের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
### কেন এই সিদ্ধান্ত?
দলীয় নেতৃত্বের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমাজকে বুঝতে হলে একাধিক চিন্তাধারা সম্পর্কে জানার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, দর্শন, মানবতাবাদ, আধ্যাত্মিক চিন্তা এবং ভারতীয় বৌদ্ধিক ঐতিহ্য সম্পর্কিত বইও এবার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সিপিএমের একাংশের মতে, স্বামী বিবেকানন্দের সমাজভাবনা, গৌতম বুদ্ধের মানবিক দর্শন এবং শঙ্করাচার্যের দার্শনিক চিন্তা ভারতীয় বৌদ্ধিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই কারণেই এই লেখাগুলিকে পাঠকদের নাগালের মধ্যে আনতে চায় দল।
### বইয়ের স্টলে কী কী থাকবে?
দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্টলগুলিতে বিভিন্ন ধরনের বই রাখা হবে। এর মধ্যে থাকবে—
* স্বামী বিবেকানন্দের নির্বাচিত রচনা
* গৌতম বুদ্ধের জীবন ও বৌদ্ধ দর্শন
* আদি শঙ্করাচার্যের দার্শনিক ভাবনা
* কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের রচনা
* ভারতীয় সংবিধান ও ইতিহাস বিষয়ক বই
* শিশু-কিশোরদের জন্য সহজপাঠ ও চিত্রভিত্তিক বই
দলীয় কর্মীদের আশা, এই বৈচিত্র্যময় সংগ্রহের ফলে বইপ্রেমীদের মধ্যে আরও বেশি আগ্রহ তৈরি হবে।
### রাজনৈতিক মহলে জল্পনা
এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সিপিএম নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে, এটি কোনও আদর্শগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। তাঁদের বক্তব্য, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রচনা পড়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং পাঠাভ্যাসকে উৎসাহিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
### বইয়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে রাজ্যে শুধু থিম, আলোকসজ্জা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বইয়ের স্টলও বহুদিন ধরে একটি পরিচিত সংস্কৃতি। অনেক মানুষ পুজোর সময় নতুন বই কেনার অভ্যাস বজায় রাখেন।
সিপিএমের দাবি, এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতেই তারা এবার বইয়ের সংগ্রহকে আরও বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে বিভিন্ন ধরনের চিন্তাধারা ও ইতিহাস পৌঁছে দেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
### বিবেকানন্দ থেকে বুদ্ধ—একই স্টলে বৈচিত্র্যের বার্তা
স্বামী বিবেকানন্দের মানবকল্যাণের বার্তা, গৌতম বুদ্ধের করুণা ও অহিংসার দর্শন এবং আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত—এই তিনটি ভিন্ন ধারার চিন্তাকে একই বইয়ের স্টলে রাখা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ।
দলীয় নেতাদের মতে, কোনও চিন্তাধারাকে বুঝতে হলে তার মূল উৎস পড়া জরুরি। সেই কারণেই পাঠকদের সামনে এই রচনাগুলি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
### পুজোর ভিড়ে নজর কাড়তে নতুন উদ্যোগ
পুজোর সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন প্যান্ডেল পরিদর্শনে বের হন। সেই ভিড়ের মধ্যেই বইয়ের স্টলগুলিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
সব মিলিয়ে, এবারের দুর্গাপুজোয় সিপিএমের বইয়ের স্টলে মার্কসবাদী সাহিত্যর পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দ, গৌতম বুদ্ধ ও আদি শঙ্করাচার্যের রচনার উপস্থিতি শুধু বইপ্রেমীদের কৌতূহলই বাড়াবে না, বরং পুজোর সাংস্কৃতিক পরিসরেও নতুন আলোচনার জন্ম দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।


