রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী **শাহবাজ শরিফ** ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলার পর কড়া পাল্টা জবাব দিল নয়াদিল্লি। ‘রাইট অব রিপ্লাই’ (Right of Reply) ব্যবহার করে ভারতের প্রতিনিধি পাকিস্তানের বক্তব্যকে ‘বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেন এবং সন্ত্রাসবাদ, সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যকলাপ ও অপারেশন সিঁদুর নিয়ে ইসলামাবাদের দাবিগুলিকে দৃঢ়ভাবে খারিজ করেন। ভারতের বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নাটকীয় বক্তব্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনাকে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।
### রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে কী বলেছিলেন শাহবাজ?
রাষ্ট্রসংঘে ভাষণ দিতে গিয়ে শাহবাজ শরিফ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, কাশ্মীর ইস্যু এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য রাখেন। তাঁর দাবি ছিল, অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাশ্মীর প্রশ্নের সমাধান অপরিহার্য। পাশাপাশি তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার জন্য নয়াদিল্লির নীতিকে দায়ী করার চেষ্টা করেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠার পরই ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
### ‘রাইট অব রিপ্লাই’-এ ভারতের কড়া বার্তা
ভারতের প্রতিনিধি পেটাল গেহলট রাষ্ট্রসংঘে ‘রাইট অব রিপ্লাই’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, “কোনও মাত্রার নাটকীয়তা সত্যকে আড়াল করতে পারে না।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করে।
ভারতের প্রতিনিধি আরও বলেন, যে দেশ সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় ও মদত দেওয়ার অভিযোগের মুখে রয়েছে, সেই দেশের পক্ষে অন্যদের মানবাধিকার বা শান্তির পাঠ দেওয়া বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে অবস্থানকারী চিহ্নিত জঙ্গিদের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
### অপারেশন সিঁদুর নিয়েও পাল্টা
ভারতের জবাবে বিশেষভাবে উঠে আসে **অপারেশন সিঁদুর** প্রসঙ্গ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই অভিযানের ফলাফল নিয়ে যে দাবি করা হয়েছিল, ভারত তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। ভারতের প্রতিনিধি বলেন, ধ্বংস হওয়া রানওয়েকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং পাকিস্তানের উচিত তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানকারী চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত আবারও সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ ইস্যুকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সামনে নিয়ে আসে।
### সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে পুরনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত
ভারতের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, সন্ত্রাসবাদকে কোনও রাষ্ট্রের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। সাম্প্রতিক সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO) সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই ধরনের বার্তা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের অর্থায়ন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের পুরো ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্যও সেই ধারাবাহিক অবস্থানকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে।
### কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি নতুন নয়
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন নয়। অতীতেও কাশ্মীর, সীমান্ত উত্তেজনা এবং সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে দুই দেশ একে অপরকে লক্ষ্য করে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
তবে এবারের বক্তব্যের বিশেষ তাৎপর্য হল, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অপারেশন সিঁদুর এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত উত্তেজনার আবহে এই কূটনৈতিক সংঘাত আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
### আন্তর্জাতিক মহলের নজর
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে দুই দেশের বক্তব্য শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে।
ভারত তার জবাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তাদের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে পাকিস্তান কাশ্মীরকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে। ফলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব এখনও স্পষ্ট বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
### বার্তার মূল সুর
রাষ্ট্রসংঘের এই কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি আবারও দেখিয়ে দিল, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মতপার্থক্য শুধু সীমান্তে নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও অব্যাহত। শাহবাজ শরিফের বক্তব্যের জবাবে ভারত যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে—নয়াদিল্লি সন্ত্রাসবাদ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুগুলিকেই আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে, আর সেই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।


