আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘিরে তদন্তে ফের নতুন করে চর্চায় এসেছে স্বাস্থ্যদপ্তরের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নারায়ণস্বরূপ নিগমের ভূমিকা। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের গতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠার পর বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যদপ্তরের তরফেও বিভাগীয় তদন্ত চলছে। সেই তদন্তের অংশ হিসেবে নির্যাতিতার বাবা-মায়ের কাছ থেকেও তথ্য ও বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর কারও বিরুদ্ধে অপরাধ বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এই প্রত্যাশাই জানিয়েছেন নির্যাতিতার বাবা।
আর জি কর কাণ্ডের সময় রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদে ছিলেন নারায়ণস্বরূপ নিগম। ঘটনার পর থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। জুনিয়র চিকিৎসকদের একাংশও বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ওই পদ থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছিলেন। তবে সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরও তিনি স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদে রয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আর জি কর সংক্রান্ত নথি ও ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যদপ্তরের তরফে পৃথক বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে। সেই তদন্তের জন্যই নির্যাতিতার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৯ আগস্টের রাতের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নির্যাতিতার বাবা স্পষ্ট করেন, তদন্তে যদি নারায়ণস্বরূপ নিগমের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধেও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নির্যাতিতার বাবার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি মূলত একটি বিভাগীয় তদন্ত। তাই তদন্ত কমিটি কী তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা করছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, আর জি কর কাণ্ডে যারা সত্যিই কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।
আর জি কর মামলায় এই তদন্তের পর্বটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছিল। ঘটনার দিন ও তার পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, স্বাস্থ্যদপ্তরের আধিকারিকদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল এবং কোথাও প্রশাসনিক গাফিলতি হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায় না। তদন্তের ফল এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
নির্যাতিতার বাবা জানিয়েছেন, তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বর্তমানে আশাবাদী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে যে বিষয়গুলি নিয়ে প্রশ্ন ছিল, সেগুলির উত্তর তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসতে পারে। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেছেন, বিভাগীয় তদন্ত কমিটি যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করবে।
এদিকে নতুন করে আর জি কর সংক্রান্ত ফাইল খোলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নির্যাতিতার বাবা জানিয়েছেন, নতুন সরকারের আমলে পুরনো বিষয়গুলি ফের খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কয়েকজন পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের পর যারা দায়ী প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে তিনি তদন্তের ফল প্রকাশ এবং যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা করেছেন।
স্বাস্থ্যদপ্তরের বিভাগীয় তদন্ত এবং ফৌজদারি তদন্ত—দুই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য এক নয়। ফৌজদারি তদন্তে অপরাধের সঙ্গে কারও সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে বিভাগীয় তদন্তে কোনও সরকারি আধিকারিকের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, প্রশাসনিক অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের মতো বিষয়ও খতিয়ে দেখা হতে পারে। ফলে নারায়ণস্বরূপ নিগমের ভূমিকা নিয়ে বর্তমানে যে আলোচনা হচ্ছে, তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন তদন্তের ফলের ওপরই নির্ভর করবে।
আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যজুড়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ—একাধিক বিষয় সামনে এসেছিল। একইসঙ্গে ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।
নির্যাতিতার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হোক। বর্তমানে স্বাস্থ্যদপ্তরের বিভাগীয় তদন্তে সেই সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরই স্পষ্ট হতে পারে, কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা অন্য কোনও ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে কি না।
সব মিলিয়ে, আর জি কর কাণ্ডে নারায়ণস্বরূপ নিগমের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্যাতিতার বাবার বক্তব্যের মূল বিষয় হল—কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে থেকেই সিদ্ধান্তে না পৌঁছে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা এবং অপরাধ বা অনিয়মের প্রমাণ মিললে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। এখন স্বাস্থ্যদপ্তরের বিভাগীয় তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং তার রিপোর্টে কী উঠে আসে, সেটাই পরবর্তী সময়ে এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।


