দিল্লির ভোটার তালিকা সংশোধনের চলমান Special Intensive Revision বা SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার আওতায় দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল-সহ তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। কেজরিওয়ালের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী সুনীতা কেজরিওয়াল, ছেলে পুলকিত কেজরিওয়াল এবং বাবা গোবিন্দ রাম কেজরিওয়াল ও মা গীতা দেবীও নোটিস পেয়েছেন। তাঁদের ভোটার নথি আগের SIR-এর সঙ্গে ম্যাপ করা যায়নি বলে ‘No Mapping’ বা ‘Unmapped with Last SIR’ বিভাগের অধীনে এই নোটিস দেওয়া হয়েছে বলে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দিল্লির নয়াদিল্লি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। নির্বাচন সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, তাঁদের নাম পার্ট-৫১, KG Marg এলাকার ১১০ জন নোটিসপ্রাপ্ত ভোটারের তালিকায় রয়েছে। চলতি SIR প্রক্রিয়ায় আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের যোগসূত্র বা mapping যাচাই করা হচ্ছে। সেই যাচাইয়ের সময় কোনও ভোটারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে আগের SIR-এর তথ্যের যোগসূত্র স্থাপন করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
তবে এই নোটিস পাওয়ার অর্থ যে কেজরিওয়াল বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভোটাধিকার চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে গিয়েছে, এমন নয়। দিল্লির নির্বাচন দফতরের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, নোটিস পাওয়া ভোটারদের প্রয়োজনীয় নথি ও জবাব সংশ্লিষ্ট Electoral Registration Officer বা ERO-এর কাছে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই নথি যাচাইয়ের পর প্রত্যেকটি নোটিসের নিষ্পত্তি করা হবে। কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাইয়ের পর তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে ERO-র বক্তব্য।
এই পরিস্থিতির পিছনে SIR-এর বৃহত্তর প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশের পর মোট ৯৭.৫৭ লক্ষ ভোটারের নাম সেখানে রয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৭৯,৭৮৫ জন ভোটারের তথ্য আগের SIR-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি বলে ‘No Mapping’ বিভাগে রাখা হয়েছে। আরও ১৯,৩৩,১৩৪ জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ‘Logical Discrepancies’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৩ লক্ষেরও বেশি ভোটার এই দুই বিভাগের আওতায় পড়েছেন। নির্বাচন দফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১.৬৩ লক্ষেরও বেশি নোটিস ইতিমধ্যেই জারি হয়েছে।
নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, SIR-এর উদ্দেশ্য হল ভোটার তালিকায় যোগ্য নাগরিকদের নাম নিশ্চিত করা এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের দেওয়া Enumeration Form-এর তথ্য আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে নিউ দিল্লি বিধানসভা কেন্দ্রের ERO জানিয়েছে, তাঁদের জমা দেওয়া ফর্মে এমন কিছু তথ্য সম্পূর্ণ ছিল না, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের আগের SIR-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে তাঁদের তথ্য যুক্ত করা সম্ভব হত। সেই কারণেই নিয়ম মেনে নোটিস পাঠানো হয়েছে।
নির্বাচন দফতরের এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। আম আদমি পার্টি প্রশ্ন তুলেছে, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের নাম কীভাবে SIR-এর নোটিসপ্রাপ্তদের তালিকায় এল। দলের তরফে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। AAP-এর বক্তব্য, কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির ভোটার হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের তথ্য নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হল, এই নোটিস কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়নি। একই প্রক্রিয়ার আওতায় দিল্লির বহু সাধারণ ভোটার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক পরিচিত ব্যক্তিও নোটিস পেয়েছেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার নামও SIR-এর সময় ‘Logical Discrepancy’ বিভাগে উঠে এসেছিল। তাঁর ক্ষেত্রে বয়স-সংক্রান্ত অসঙ্গতি চিহ্নিত করে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। পরে Booth Level Officer বা BLO-র মাধ্যমে শারীরিক যাচাই এবং নথি পরীক্ষা করার পর তাঁর ভোটার এন্ট্রি যাচাই করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য তা রাখা হয়েছে।
এছাড়াও প্রাক্তন দিল্লি BJP সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেব, তাঁর স্ত্রী ও ভাইয়ের নামও নোটিসপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছে। রাজ্যসভা সাংসদ কপিল সিবাল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও SIR-সংক্রান্ত নোটিস জারি হয়েছে। ফলে নির্বাচন দফতরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি শুধুমাত্র কোনও একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বা সমর্থকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি প্রক্রিয়া নয়; ভোটারদের নথি যাচাইয়ের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবেই নোটিস দেওয়া হচ্ছে।
এখন কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সামনে মূল বিষয় হল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি ও জবাব নির্বাচন আধিকারিকের কাছে জমা দেওয়া। নির্বাচন দফতর জানিয়েছে, নোটিসগুলির নিষ্পত্তি ২৯ অক্টোবরের মধ্যে করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ৪ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশ করার কথা। ফলে কেজরিওয়াল পরিবারের ভোটার নথি যাচাইয়ের চূড়ান্ত ফলও সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই স্পষ্ট হবে।
এদিকে দিল্লির SIR প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও প্রশাসনিকভাবে নোটিসের পরবর্তী ধাপ হল নথি যাচাই ও শুনানি। নির্বাচন দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও ভোটারের নাম খসড়া তালিকায় না থাকলেও সেটি নিজে থেকেই চূড়ান্তভাবে ভোটার হওয়ার অযোগ্যতা প্রমাণ করে না। যোগ্য ভোটারদের দাবি ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে নোটিস জারির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে তাঁদের জমা দেওয়া নথি এবং সেই নথির ভিত্তিতে ERO-র সিদ্ধান্ত।


