রোজভ্যালি চিটফান্ড কাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রোজভ্যালির আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ছ’মাসের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে এই নির্দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রোজভ্যালি গোষ্ঠীর বিভিন্ন আমানত প্রকল্পে বহু মানুষ তাঁদের কষ্টার্জিত টাকা জমা রেখেছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ের পরে বেশি সুদে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। অনেকেই অবসরজীবনের সঞ্চয়, মেয়ের বিয়ের টাকা, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা ছোট ব্যবসার পুঁজি রোজভ্যালির বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও বহু আমানতকারী তাঁদের টাকা ফেরত পাননি। এরপরই বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
রোজভ্যালি কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি উঠেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি রোজভ্যালি গোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্পত্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, জমি, হোটেল এবং অন্যান্য সম্পদ চিহ্নিত করে। সেই সম্পদ বিক্রি করে বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ আইনি জটিলতা, সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যা এবং আমানতকারীদের দাবির যাচাইয়ের কারণে পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়নি।
এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাই কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আদালত জানিয়েছে, টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আদালতের নির্দেশ কার্যকর হলে বহু আমানতকারী তাঁদের পাওনা অর্থের একটি অংশ বা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে প্রত্যেক আমানতকারী কত টাকা পাবেন, তা নির্ভর করবে তাঁদের জমা সংক্রান্ত নথি, দাবির বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের নিষ্পত্তির উপর।
রোজভ্যালি আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর জন্য আগে থেকেই একটি সম্পদ নিষ্পত্তি কমিটি বা Assets Disposal Committee গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির দায়িত্ব হল রোজভ্যালি গোষ্ঠীর সম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদ চিহ্নিত করা, সেগুলির মূল্য নির্ধারণ, বিক্রির ব্যবস্থা করা এবং সেই অর্থ থেকে যোগ্য আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। বিভিন্ন পর্যায়ে এই কমিটির মাধ্যমে কিছু আমানতকারীকে টাকা ফেরত দেওয়া হলেও বহু মানুষ এখনও তাঁদের সম্পূর্ণ পাওনা পাননি।
আমানতকারীদের অভিযোগ, টাকা ফেরতের প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের জটিলতা রয়েছে। অনেকের দাবি, তাঁরা প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও টাকা পাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাচ্ছেন না। কারও আবেদন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে, আবার কারও নাম তালিকায় থাকলেও অর্থপ্রাপ্তির তারিখ নির্দিষ্ট হয়নি। ফলে আদালতের নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত পদ্ধতিতে কাজ করার দাবি জানিয়েছেন আমানতকারীরা।
টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের নথিপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা রোজভ্যালির বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা জমা রেখেছিলেন, তাঁদের জমার রসিদ, সার্টিফিকেট, বন্ড, পরিচয়পত্র, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। কোনও আমানতকারী আগে দাবি জমা না দিয়ে থাকলে, সংশ্লিষ্ট সরকারি বা অনুমোদিত কমিটির নির্দেশিকা অনুযায়ী আবেদন করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। ভুয়ো এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস না করার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
রোজভ্যালি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিও একাধিকবার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, আমানতকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই সম্পদগুলির একটি অংশ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য, আইনি মালিকানা এবং মামলার বিভিন্ন পর্যায়ের কারণে অর্থ ফেরতের কাজ সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।
কলকাতা হাই কোর্টের ছ’মাসের নির্দেশের ফলে এবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির উপর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। আদালতের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কতজন আমানতকারীর দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে—এই সমস্ত বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদালতের কাছে অগ্রগতির রিপোর্টও জমা দিতে হতে পারে।
এই নির্দেশের ফলে রোজভ্যালি আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলা, তদন্ত এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে আটকে থাকা মানুষজন এবার তাঁদের টাকা ফেরতের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইছেন। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অনেকের সংসার চালানো বা চিকিৎসার খরচও ওই সঞ্চয়ের উপর নির্ভরশীল।
তবে আদালতের নির্দেশের পরেও টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি ধাপ বাকি থাকতে পারে। সব আমানতকারীর দাবি একই সময়ে মেটানো সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে সম্পদের নিষ্পত্তি, দাবির যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের উপর। তাই আমানতকারীদের সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও অনুমোদিত সূত্রের তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রোজভ্যালি মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের এই নির্দেশ আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ছ’মাসের মধ্যে টাকা ফেরানোর নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমানতকারীরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পান কি না, তার উপরই এই নির্দেশের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে।


