তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নাম, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে চলা বিরোধ এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, এই বিতর্কে নির্বাচন কমিশন ফের দুই পক্ষের বক্তব্য শুনতে চলেছে। ফলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে, এদিনই কি তৃণমূলের প্রতীক ও দলীয় পরিচয় নিয়ে কোনও অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে কমিশন? যদিও এখনও পর্যন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীকের অধিকার নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী। দুই পক্ষই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করছে। দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনী প্রতীক, দলীয় সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে এই বিরোধ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সামনে উভয় পক্ষই নিজেদের দাবির সমর্থনে নথি ও যুক্তি পেশ করেছে।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চের সামনে দুই গোষ্ঠীর পৃথক শুনানি হতে পারে। প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ডাকা হয়েছে। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন শিবিরের প্রতিনিধিরা কমিশনের সামনে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন। দুই পক্ষের বক্তব্য, জমা দেওয়া নথি এবং সাংগঠনিক সমর্থনের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার পর কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
এর আগে ১২ সেপ্টেম্বরও দুই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই বৈঠকে দলীয় নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। ঋতব্রত শিবিরের তরফে দাবি করা হয়, দলের অধিকাংশ নির্বাচিত বিধায়কের সমর্থন তাদের সঙ্গে রয়েছে। সেই সমর্থনের ভিত্তিতেই তারা তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন শিবির কমিশনের কাছে নিজেদের বক্তব্য জানিয়ে জানিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পরিচয় ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে তাদের দাবিই বৈধ। দলের তরফে অন্তর্বর্তী কোনও আদেশ জারি না করার বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দলের নেতারা বারবার দাবি করেছেন, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং দলীয় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এই বিরোধের মধ্যেই কমিশন মমতা শিবিরকে ঋতব্রত গোষ্ঠীর জমা দেওয়া নথির ভিত্তিতে লিখিত জবাব দিতে বলেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টার মধ্যে অতিরিক্ত বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কমিশন দুই পক্ষের জমা দেওয়া নথি ও যুক্তি পর্যালোচনা করে অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তের পথে এগোতে পারে। তবে সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট সময় এখনও নিশ্চিত নয়।
এই বিতর্কের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন হওয়ার কথা। ওই দুই কেন্দ্রে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। ফলে প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রার্থী, দলীয় প্রচার এবং ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যদি দুই পক্ষই একই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচনী ময়দানে নামে, তাহলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সেই কারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে। কমিশনকে নির্ধারণ করতে হবে, কোন গোষ্ঠী তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক প্রতিনিধিত্ব করবে এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের অধিকার কার থাকবে।
তবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রতীক বা নামের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে দলের সাংগঠনিক সম্পদ, কার্যালয়, দলীয় নথি, রাজনৈতিক প্রচার এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী কার্যকলাপও জড়িয়ে যেতে পারে। যে গোষ্ঠী দলীয় নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি পাবে, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত হতে পারে। অপরদিকে, অন্য গোষ্ঠীকে বিকল্প নাম বা প্রতীক নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হতে পারে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ এই সংঘাত ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কমিশন সাধারণত দুই পক্ষের সাংগঠনিক সমর্থন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবস্থান, দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো এবং জমা দেওয়া নথি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
এখন নজর বৃহস্পতিবারের শুনানির দিকে। কমিশন এদিন দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় কি না, নাকি আরও নথি ও ব্যাখ্যা চায়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তৃণমূলের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে। ফলে ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানি দলটির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক পরিচয় এবং আসন্ন উপনির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


