তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাত এবার আরও তীব্র আকার নিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ মোট ১০ জন বিধায়কের বিধায়ক পদ খারিজের দাবিতে বিধানসভার স্পিকারের কাছে আবেদন করার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছে কালীঘাটের তৃণমূল শিবির। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন সরাসরি সাংবিধানিক ও আইনি লড়াইয়ের পথে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে থাকা ১০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। কালীঘাট শিবিরের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বিধায়কেরা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, নাম ও নির্বাচনী প্রতীকের উপর দাবি জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে তাঁদের বিধায়ক পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিধানসভার স্পিকার বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। তবে স্পিকারের সিদ্ধান্তে দেরি হওয়ায় কালীঘাট শিবির সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে বলে জানা গিয়েছে।
## ঋতব্রতকে নিশানা রীতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, একজন ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী কোনও রাজনৈতিক দল চলতে পারে না। দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং প্রতীকের মালিকানা নিয়ে সমস্ত সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হওয়া উচিত।
ঋতব্রত শিবিরের দাবি, তাঁদের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক নির্বাচিত বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। সেই সমর্থনের ভিত্তিতেই তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের উপর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, দলের প্রকৃত সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
ঋতব্রত আরও অভিযোগ করেছেন, তৃণমূলের বর্তমান নেতৃত্বে একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, দলীয় সিদ্ধান্তে বিধায়কদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। যদিও কালীঘাট শিবির এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে।
## ৫০ বিধায়ককে ঘরে ফেরার বার্তা
অন্যদিকে, তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী শিবিরে থাকা বাকি বিধায়কদের উদ্দেশে আলাদা বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকা বিধায়কেরা চাইলে এখনও তৃণমূলে ফিরে আসতে পারেন। তাঁদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঘরে ফেরার সুযোগ রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
তবে ঋতব্রত-সহ চিহ্নিত ১০ জন নেতার ক্ষেত্রে দলের অবস্থান কঠোর বলে জানিয়েছেন কল্যাণ। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনওরকম সমঝোতার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৫০ জন বিধায়ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বা তাঁদের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁদের উদ্দেশে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা, তাঁরা যেন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক হন এবং দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করেন।
এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, তৃণমূল নেতৃত্ব কি বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশকে ফিরিয়ে এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে? নাকি ১০ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বাকিদের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে? রাজনৈতিক মহলে এই নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
## নির্বাচন কমিশনের কাছেও প্রতীক নিয়ে লড়াই
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুধু বিধানসভা বা আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গোষ্ঠীই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের দাবি জানিয়েছে।
ঋতব্রত শিবিরের পক্ষ থেকে কমিশনে একাধিক নথি জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থন, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কমিশন তাঁদের কাছে আরও কিছু নথি চেয়েছে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবিরও নিজেদের দাবির পক্ষে নথি জমা দিয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর কমিশন অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছে। কোন গোষ্ঠী তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে, সে বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
## উপনির্বাচনের আগে সংঘাত আরও গুরুত্বপূর্ণ
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনের আগে এই বিরোধ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই গোষ্ঠীই নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে এবং দলীয় প্রতীক ব্যবহারের দাবি জানিয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর দুই শিবিরের রাজনৈতিক কৌশল অনেকটাই নির্ভর করছে।
যদি কোনও একটি গোষ্ঠীকে তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে অন্য গোষ্ঠীর প্রার্থীদের প্রতীক ও দলীয় পরিচয় নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। সেই কারণেই উপনির্বাচনের আগে প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত মেটানোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে, বিধায়ক পদ খারিজের আবেদন নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনও বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নিতে হলে তাঁর কার্যকলাপ, দলীয় সদস্যপদ, পৃথক গোষ্ঠী গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান খতিয়ে দেখতে হয়। ফলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে সদস্যপদ বাতিল হবে না; নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
## আইনি লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে তৃণমূলের সংঘাত
ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের দাবি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেল। একদিকে নির্বাচন কমিশনে দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়াই, অন্যদিকে বিধানসভার স্পিকার ও সুপ্রিম কোর্টে বিধায়ক পদ নিয়ে আবেদন—সব মিলিয়ে সংঘাত এখন বহুমাত্রিক।
কালীঘাট শিবিরের অভিযোগ, বিদ্রোহী বিধায়কেরা দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙেছেন। বিপরীতে ঋতব্রত শিবিরের দাবি, তাঁরা দলের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছেন। দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই নির্ভর করছে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো।
এখন নজর থাকবে বিধানসভার স্পিকারের পদক্ষেপ, সুপ্রিম কোর্টে মামলার অগ্রগতি এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে। এই তিনটি ক্ষেত্রেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


