মালদহের ভূতনি জুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। চারদিকে শুধু জল আর জল। গঙ্গার ভয়ংকর স্রোতে একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও বাড়ির একতলা পর্যন্ত জল উঠে গিয়েছে, কোথাও আবার ১০ থেকে ১২ ফুট জলের নিচে চলে গিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে উঁচু রাস্তার ধারে, রিং বাঁধে কিংবা কোনও উঁচু বাড়ির ছাদে। খাবার, পানীয় জল এবং ওষুধের জন্য হাহাকার চলছে বানভাসি মানুষের মধ্যে। ত্রাণ পৌঁছনোর খবর পেলেই টিনের তৈরি ডোঙা নিয়ে ছুটে আসছেন দুর্গতরা।
গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধি এবং নদীভাঙনের জেরে ভূতনি ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। প্রশাসনের তরফে ত্রাণ শিবির, লঙ্গরখানা, নৌকা এবং উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হলেও প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে পৌঁছতে এখনও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ফলে দুর্গত মানুষের একাংশের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ ও পানীয় জল পর্যাপ্ত নয়।
গঙ্গার জলে ডুবে বিস্তীর্ণ ভূতনি
ভূতনি থানার একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বন্যার জল ঢুকে পড়েছে। বহু গ্রাম এখনও জলবন্দি। কোথাও বাড়িঘর সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছে, কোথাও আবার ছাদে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে উঁচু রাস্তা কিংবা বাঁধের উপর অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, গঙ্গার জল দ্রুত বাড়তে থাকায় তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানোরও সুযোগ পাননি। অনেকের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, গবাদি পশু এবং চাষের জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ায় ভবিষ্যতে ফসলের ক্ষতি এবং জীবিকা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এখন নৌকা। প্রশাসনিক আধিকারিক, পুলিশকর্মী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা নৌকায় করে দুর্গতদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রবল স্রোত ও জলমগ্ন রাস্তার কারণে সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না।
ত্রাণের জন্য ডোঙা নিয়ে ছুটছেন মানুষ
ভূতনির বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ পৌঁছনোর খবর ছড়িয়ে পড়লেই স্থানীয় মানুষ টিনের তৈরি ডোঙা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। বুধবার ভূতনি সেতুর কাছে ত্রাণ পৌঁছনোর খবর পেয়ে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ জলে ভেসে সেখানে আসেন। তাঁদের মধ্যে মহিলা এবং শিশুও ছিল।
ত্রাণ হিসেবে চিড়ে, গুড়, মুড়ি, চাল, ডাল এবং পানীয় জল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দুর্গত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ত্রাণ সংগ্রহের সময় ভিড় ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, দূরবর্তী গ্রামগুলিতে নিয়মিত ত্রাণ পৌঁছচ্ছে না। ফলে অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে বা অল্প খাবারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মালদহ জেলা প্রশাসনের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের মতো ত্রাণ নিয়ে বড় ধরনের কাড়াকাড়ির পরিস্থিতি কোথাও তৈরি হয়নি। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছতে যথেষ্ট সমস্যা হচ্ছে। সেই সমস্যা কাটাতে নৌকা এবং স্পিডবোটের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।
১১টি ত্রাণ শিবির ও ১৫টি লঙ্গরখানা চালু
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মালদহ জেলা প্রশাসন একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বানভাসি এলাকায় ১১টি ত্রাণ শিবির এবং ১৫টি লঙ্গরখানা চালু করা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এছাড়াও একশোর বেশি নৌকা মোতায়েন করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলায় এনডিআরএফ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও কাজে নামানো হয়েছে। জলবন্দি মানুষদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া, আটকে থাকা পরিবারগুলিকে উদ্ধার করা এবং দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
ত্রাণ ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করার জন্য উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে বিশেষ জোনাল রিলিফ অফিস চালু করা হয়েছে। এই অফিসের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার চাহিদা চিহ্নিত করে সরাসরি ত্রাণ পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে
সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানও ত্রাণকাজে এগিয়ে এসেছে। মালদহের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি জেলা প্রশাসনের ডাকে সাড়া দিয়ে চাল, ডাল, চিড়ে, মুড়ি, পানীয় জল এবং মশারির মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠিয়েছে।
তিনটি বড় ট্রাকে করে ত্রাণসামগ্রী মানিকচকে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে নৌকা ও অন্যান্য পরিবহণের মাধ্যমে জলবন্দি এলাকাগুলিতে সেগুলি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রামকৃষ্ণ মিশন, রেডক্রস এবং স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে শুধু শুকনো খাবার বা ত্রাণসামগ্রী নয়, দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে পানীয় জল, শৌচাগার, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং স্যানিটেশনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় স্বাস্থ্য দপ্তরকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
১৮০-র বেশি গর্ভবতী মহিলাকে উদ্ধার
বন্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন গর্ভবতী মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষজন। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জলবন্দি এলাকা থেকে ১৮০ জনেরও বেশি গর্ভবতী মহিলাকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয় বা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ভুতনি থানার পুলিশ গভীর রাতে প্রসবযন্ত্রণায় থাকা পাঁচজন গর্ভবতী মহিলাকে স্পিডবোটে করে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। চারদিকে জল এবং অন্ধকারের মধ্যেও পুলিশ নৌকাকে কার্যত অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে ব্যবহার করে। এই উদ্যোগের ফলে সংকটাপন্ন মহিলাদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।
বন্যার সময় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রাস্তা ডুবে যাওয়ায় অ্যাম্বুল্যান্স চলাচল করতে পারে না। ফলে নৌকাই হয়ে ওঠে জরুরি চিকিৎসা ও রোগী পরিবহণের প্রধান মাধ্যম।
বিধায়ক ও প্রশাসনের তৎপরতা
মানিকচকের বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল ভূতনির বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সিভিল ডিফেন্সের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বানভাসি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ত্রাণ ও পানীয় জল ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখেন।
বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁদের দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জলবন্দি মানুষদের উঁচু জায়গা, আশ্রয় শিবির এবং স্কুলবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা স্পিডবোট ও নৌকা করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছে শুকনো খাবার এবং ওষুধ বিলি করছেন। তবে জলস্তর এবং স্রোতের পরিস্থিতির কারণে প্রত্যেকটি গ্রামে পৌঁছনো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
দেড় লক্ষের বেশি মানুষ বিপর্যস্ত
ভূতনি থানার তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বন্যার জল পুরোপুরি নামেনি। এখনও প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ জলযন্ত্রণায় ভুগছেন বলে জানা গিয়েছে। বহু গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। অনেক পরিবার দিনের পর দিন ঘরবাড়ির বাইরে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন।
বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙনও বড় বিপদ তৈরি করেছে। গঙ্গার স্রোতে বাড়িঘর, রাস্তা, বাঁধ এবং কৃষিজমি ভেঙে পড়ছে। কোথাও নদী ধীরে ধীরে বসতভূমির দিকে এগিয়ে আসছে। ফলে যাঁরা এখনও বাড়িতে রয়েছেন, তাঁরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
মালদহে গঙ্গার ভাঙন ও বন্যা নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বছর বর্ষার সময় ভূতনি, মানিকচক এবং রতুয়া-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় জল ঢুকে পড়ে। কিন্তু এ বার পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এর আগে গঙ্গার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল রাজ্য সরকার। কানপুর আইআইটি, বিশেষজ্ঞ দল, জলশক্তি মন্ত্রক এবং বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সমন্বয় বৈঠকের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
নদীভাঙন ঠেকাতে বালির বস্তা, প্রোকোপাইন প্রযুক্তি এবং উন্নত কংক্রিট ব্লক ম্যাট্রেস ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাঁধ মেরামত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর গতিপথ, পলি জমা, জলপ্রবাহ এবং বাঁধের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, গঙ্গার ভয়ংকর স্রোতে ভূতনি কার্যত বিপর্যস্ত। ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়হীন। ত্রাণ, পানীয় জল এবং চিকিৎসার জন্য মানুষের হাহাকার অব্যাহত। প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালালেও প্রত্যন্ত এলাকায় সাহায্য পৌঁছনো এখনও কঠিন। বন্যা পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হলেও দেড় লক্ষের বেশি মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। এখন দ্রুত ত্রাণ পৌঁছনোর পাশাপাশি নদীভাঙন ও বন্যা রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।


