‘বন্দে মাতরম’ গান সম্পূর্ণ গাওয়া নিয়ে এবার প্রকাশ্যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হলেন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের মতোই জাতীয় গানের পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশন করা নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তির জবাবে ওমর প্রশ্ন তুলেছেন, “কংগ্রেস কি কাশ্মীরিদের জেলে দেখতে চায়?” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের জোটসঙ্গী সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
### আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত
জম্মু-কাশ্মীরে প্রথমবার আয়োজিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং তাঁর বাবা তথা ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রবীণ নেতা ফারুক আবদুল্লাহ। সেই অনুষ্ঠানেই পূর্ণ সংস্করণ বাজানো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় গানের প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া উচিত। দলের সাধারণ সম্পাদক কে. সি. বেণুগোপাল ন্যাশনাল কনফারেন্সকে এই অবস্থান মেনে চলার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা যে ঐতিহাসিক সমঝোতার মাধ্যমে গানটির প্রথম দুটি স্তবককে গ্রহণ করেছিলেন, তা অগ্রাহ্য করা উচিত নয়।
### ওমরের পালটা প্রশ্ন, ‘কাশ্মীরিদের জেলে পাঠাতে চান?’
কংগ্রেসের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ওমর আবদুল্লাহ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়ার কারণে কি কংগ্রেস কাশ্মীরিদের জেলে পাঠাতে চায়? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ণ সংস্করণ গাওয়া এখন আইনি দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে এবং এই নিয়ম শুধু জম্মু-কাশ্মীরের জন্য নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্যের সরকারি অনুষ্ঠানেও প্রযোজ্য।
ওমর আরও বলেন, সংসদে যখন এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন কংগ্রেস তা আটকায়নি। এখন যদি দল মনে করে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তাহলে ক্ষমতায় ফিরে এসে আইন পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ন্যাশনাল কনফারেন্স আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সরকারি নির্দেশ বা আইনি দায়িত্ব অমান্য করতে রাজি নয়।
### ন্যাশনাল কনফারেন্সের অবস্থান কী?
ন্যাশনাল কনফারেন্সের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’কে তারা অসম্মান করছে না। তবে পূর্ণ সংস্করণ গাওয়ার বিষয়ে দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান রয়েছে। দলের বক্তব্য, জাতীয় গানের মর্যাদা বজায় রেখেই ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার প্রথা অনুসরণ করা উচিত।
তবে একইসঙ্গে ন্যাশনাল কনফারেন্স জানিয়েছে, সরকারি অনুষ্ঠানে পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশনের বিষয়ে যদি কোনও আইনি নির্দেশ থাকে, তা পালন করা হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক আপত্তি থাকলেও আইনি দায়িত্ব অস্বীকার করা হবে না—এই অবস্থানই সামনে এসেছে।
### কংগ্রেসের আপত্তি কোথায়?
কংগ্রেসের আপত্তির মূল জায়গা শুধু গানটির দৈর্ঘ্য নয়, বরং এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। দলের নেতাদের বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলেও গানটির পরবর্তী স্তবকগুলিতে দেবী দুর্গার উল্লেখ রয়েছে। তাই দেশের সমস্ত ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষের অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
কংগ্রেসের মতে, জাতীয় প্রতীককে রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার করা উচিত নয়। দলের নেতারা মনে করছেন, জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে এমন কোনও পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, যাতে দেশের সমস্ত নাগরিক নিজেদের সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন। এই যুক্তিতেই পূর্ণ সংস্করণ গাওয়ার পরিবর্তে প্রথম দুটি স্তবক ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করেছে কংগ্রেস।
### বিজেপির আক্রমণের মুখে কংগ্রেস
এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে বিজেপিও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করেছে। বিজেপির নেতাদের অভিযোগ, কংগ্রেস জাতীয় প্রতীক এবং দেশাত্মবোধের মতো বিষয়েও রাজনৈতিক আপসের পথ নিচ্ছে। বিজেপি নেতা নীতিন নবীন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে বলেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর গুরুত্ব বুঝতে কংগ্রেস ব্যর্থ হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও পূর্ণ সংস্করণ গাওয়ার বিরোধিতাকে জাতীয়তাবিরোধী অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; বিজেপিও এটিকে জাতীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।
### জোট রাজনীতিতে নতুন চাপ
জম্মু-কাশ্মীরে কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্স রাজনৈতিকভাবে সহযোগী দল। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে দুই দলের অবস্থান এক নয়। কংগ্রেস যেখানে ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার পক্ষে, সেখানে ন্যাশনাল কনফারেন্স পূর্ণ সংস্করণ গাওয়াকে আইনি দায়িত্ব হিসেবে দেখছে।
এই মতপার্থক্য জোট রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল রাজনৈতিক অঞ্চলে জাতীয় প্রতীক, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়গুলি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়। তাই ওমর আবদুল্লাহর মন্তব্যের পর দুই শরিক দলের সম্পর্ক কতটা প্রভাবিত হয়, তা নজরে থাকবে।
### আইন, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন
‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামনে এসেছে—আইনি নির্দেশ, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। ওমর আবদুল্লাহর বক্তব্যে আইনি দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস ঐতিহাসিক সমঝোতা এবং সর্বজনগ্রাহ্যতার প্রশ্ন তুলেছে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, কোনও জাতীয় গান বা প্রতীক পরিবেশনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের বাধ্যবাধকতা কতটা এবং তার সীমা কোথায়। সরকারি অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও তা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেই বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
### সামনে কী হতে পারে?
বর্তমানে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্ককে ঘিরে কংগ্রেস, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। ওমর আবদুল্লাহর মন্তব্যের পর কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আরও পালটা বক্তব্য আসতে পারে। একইসঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর কংগ্রেস নেতৃত্বও এই বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ওমর আবদুল্লাহ কংগ্রেসকে সরাসরি আক্রমণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই বিষয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্স আপস করতে চাইছে না। অন্যদিকে কংগ্রেস ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের যুক্তি সামনে রেখে নিজেদের অবস্থানে অনড়। ফলে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনেও আরও তীব্র হতে পারে।


