জম্মু-কাশ্মীরে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উদ্দেশে নতুন করে হুমকির অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের সভাপতি ফারুক আবদুল্লার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন চাপানউতোর। তাঁর প্রশ্ন, যদি কেবল কাশ্মীরি পণ্ডিতরাই জঙ্গিদের নিশানায় থাকেন, তাহলে উপত্যকায় কর্মরত অন্যান্য হিন্দু আধিকারিকদের কেন একই ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে না? একইসঙ্গে পুরো ঘটনাকে জম্মু-কাশ্মীরকে ফের রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া থেকে দূরে রাখার একটি ‘ষড়যন্ত্র’ বলেও দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার অনন্তনাগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই মন্তব্য করেন ফারুক আবদুল্লা। সম্প্রতি কাশ্মীরি পণ্ডিত কর্মীদের লক্ষ্য করে হুমকিমূলক চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই উপত্যকায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফারুকের বক্তব্য, জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরের রাজ্য থেকে আসা বহু হিন্দু আধিকারিক কাজ করছেন। পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদেও রয়েছেন হিন্দু আধিকারিকরা। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশে একই ধরনের হুমকি কেন আসছে না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
### ঠিক কী নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ?
সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিশানা করে দুটি হুমকির চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই চিঠিতে উপত্যকা ছেড়ে যাওয়া এবং আরএসএসের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কাশ্মীরে থেকে যাওয়া পণ্ডিতরা নিরাপদ থাকবেন, কিন্তু যারা উপত্যকা ছেড়ে গিয়েছেন এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের উপর নজর রাখা হচ্ছে।
চিঠিতে আহমেদ বিলাল নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ এই হুমকির উৎস ও সত্যতা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে এই চিঠির সঙ্গে ‘ইউনাইটেড লিবারেশন কাউন্সিল’ নামের একটি সংগঠনের যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে বলে সংবাদ প্রতিদিন জানিয়েছে। ওই সংগঠনকে লস্কর-ই-তইবার একটি ফ্রন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে তদন্তের ফলাফল ও হুমকির পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারি তদন্তের ফলের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
### ফারুক আবদুল্লার প্রশ্ন কোথায়?
এই হুমকির ঘটনা নিয়েই ফারুক আবদুল্লা মূলত প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কাশ্মীর উপত্যকায় বাইরের বহু হিন্দু আধিকারিক দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের ডিজি, ডিআইজি, এসপি এবং জেলা পর্যায়ের এসপি পদেও হিন্দু আধিকারিক রয়েছেন। যদি শুধুমাত্র হিন্দু হওয়াই জঙ্গিদের নিশানা হওয়ার কারণ হয়, তাহলে তাঁদের কেন একই ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে না—এই প্রশ্ন তুলেছেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা।
ফারুকের মতে, এই ধরনের হুমকি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তাঁর অভিযোগ, জম্মু-কাশ্মীরে শান্তি ফিরে এসেছে এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন দাবি করা হলেও নতুন করে হুমকির ঘটনা সেই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনের কাছেও এই হুমকির উৎস এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট উত্তর চাওয়া হয়েছে।
### রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো নিয়েও প্রশ্ন
ফারুক আবদুল্লার মন্তব্যের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রসঙ্গ। তাঁর অভিযোগ, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হুমকি দিয়ে উপত্যকায় ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে এবং এর পিছনে জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি সত্যিই উপত্যকায় সম্পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং সন্ত্রাসবাদ শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের লক্ষ্য করে এই ধরনের হুমকি আসছে কোথা থেকে? তাঁর বক্তব্য, এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকেই দিতে হবে।
### কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিরাপত্তা ফের আলোচনায়
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিরাপত্তার বিষয়টি জম্মু-কাশ্মীরের রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সন্ত্রাসবাদ ও হুমকির পরিবেশের মধ্যে বিপুল সংখ্যক কাশ্মীরি পণ্ডিত উপত্যকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের প্রত্যাবর্তন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে কেন্দ্র এবং জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনের একাধিক উদ্যোগ হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত পণ্ডিত কর্মীদের একটি অংশ উপত্যকায় ফিরে কাজ করছেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে অতীতে একাধিকবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন হুমকির অভিযোগ সামনে আসায় সেই পুরনো আশঙ্কাই ফের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কাশ্মীরি পণ্ডিত কর্মীদের একটি সংগঠনও নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
### রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা
ফারুক আবদুল্লার মন্তব্যের ফলে বিষয়টি এখন শুধুমাত্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, উপত্যকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তন—এই তিনটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
একদিকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উদ্দেশে আসা হুমকির সত্যতা ও উৎস খুঁজে বের করা প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, এই ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
সব মিলিয়ে, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন হুমকির অভিযোগের মধ্যেই ফারুক আবদুল্লার প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি যেখানে ঘটনাটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করছেন, সেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হুমকির উৎস, উদ্দেশ্য এবং এর পিছনে কারা রয়েছে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিললেই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


