গণেশ চতুর্থীর আবহে সীমান্তের ওপার থেকে আসা একটি ভিডিও এখন নেটদুনিয়ায় বেশ চর্চিত। পাকিস্তানের করাচিতে বসবাসকারী এক মারাঠি পরিবারের জন্য গণপতি বাপ্পার মূর্তি রাঙাতে দেখা গেল এক মুসলিম শিল্পীকে। করাচির একটি গণেশ মন্দিরে বসে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে প্রতিমার গায়ে রং ও নানা সূক্ষ্ম নকশা ফুটিয়ে তুলছেন ওই শিল্পী। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর ধর্মের সীমারেখা পেরিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতির এই মুহূর্তকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
### করাচির গণেশ মন্দিরে দেখা গেল অন্য ছবি
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি শেয়ার করেছেন করাচিতে বসবাসকারী Amar Parkash নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে করাচিতে বসবাসকারী মারাঠা হিসেবে পরিচয় দেন এবং নিয়মিত পাকিস্তানের জীবনযাত্রা ও সেখানকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মুহূর্তের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, করাচির **Ganesh Math Mandir**-এর ভিতরে একটি সাদা গণেশমূর্তি রাখা রয়েছে। তার সামনে বসে এক শিল্পী প্রথমে স্প্রে পেইন্টের সাহায্যে মূর্তিতে প্রাথমিক রং লাগাচ্ছেন। এরপর তুলি দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিমার বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম রঙের কাজ করছেন তিনি। শেষপর্যায়ে সোনালি ও রুপোলি রঙ ব্যবহার করে গণেশমূর্তিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।
### শিল্পীকে মুসলিম বলে দাবি পোস্টদাতার
ভিডিওটি শেয়ার করার সময় Amar Parkash দাবি করেন, মূর্তিটি রাঙাচ্ছেন একজন মুসলিম শিল্পী। তাঁর পোস্টের বর্ণনা অনুযায়ী, করাচির ওই মন্দিরটি একটি মহারাষ্ট্রীয় পরিবারের পরিচালনায় রয়েছে এবং সেখানে গণপতি বাপ্পার পুজোর প্রস্তুতি চলছিল।
তবে এই পরিচয় ও ভিডিওতে দেখা ঘটনার সবিস্তারে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংবাদমাধ্যমগুলিও উল্লেখ করেছে যে প্রতিবেদনটি মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিও এবং পোস্টদাতার দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভরশীল। তাই শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা মন্দিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত কোনও দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
### ‘কে হিন্দু, কে মুসলিম?’ বার্তা ঘিরে চর্চা
ভিডিওটির সবচেয়ে নজরকাড়া অংশগুলির একটি হল তার উপর লেখা বার্তা। সেখানে লেখা হয়েছে—**“Kaun Hindu, kaun Muslim? The power of Bappa and beauty of Karachi.”** অর্থাৎ, হিন্দু-মুসলিম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গণপতি বাপ্পা ও করাচির সৌন্দর্যের একটি বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
এই বার্তাই ভিডিওটিকে শুধুমাত্র একটি প্রতিমা রং করার দৃশ্যের মধ্যে আটকে রাখেনি। বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই এটিকে সম্প্রীতি, শিল্প এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।
### নেটদুনিয়ায় প্রশংসার বন্যা
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর কমেন্ট সেকশনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বহু নেটিজেন হৃদয়ের ইমোজি দিয়ে নিজেদের ভালো লাগা প্রকাশ করেছেন। কেউ শিল্পীর দক্ষতার প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ এই ঘটনাকে ধর্মীয় বিভেদের বাইরে মানবিকতার উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন।
একাধিক মন্তব্যে উঠে এসেছে ‘মানবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম’-এর মতো বক্তব্য। কেউ লিখেছেন, প্রতিমাটি অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। আবার কেউ শিল্পীর কাজের প্রশংসা করে জানিয়েছেন, শিল্পের কোনও ধর্ম হয় না।
অবশ্য সব প্রতিক্রিয়াই যে ইতিবাচক ছিল, তা নয়। কয়েকজন ব্যবহারকারী বলেছেন, শিল্পী তাঁর পেশাগত কাজই করছেন এবং সেটিকে অতিরিক্তভাবে ‘সম্প্রীতির ঘটনা’ হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। ফলে ভিডিওটি ঘিরে প্রশংসার পাশাপাশি ভিন্ন মতও সামনে এসেছে।
### পাকিস্তানে মারাঠি পরিবারের গণেশ উৎসব
করাচিতে মারাঠি পরিবারের বসবাস এবং গণেশ চতুর্থী পালন অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় Amar Parkash-এর প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টে পাকিস্তানে বসবাসকারী মারাঠি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক চর্চার নানা ছবি উঠে আসে।
Ganesh Math Mandir-এ গণেশমূর্তির প্রস্তুতির এই ভিডিও সেই সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকেই নতুন করে সামনে এনেছে। গণেশ চতুর্থী মূলত মহারাষ্ট্রের অন্যতম বড় উৎসব হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশ্বের নানা জায়গায় বসবাসকারী ভারতীয় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসব পালন করেন। করাচিতেও স্থানীয় মারাঠি পরিবারের মধ্যে সেই ঐতিহ্য বজায় থাকার ছবি ভিডিওটির মাধ্যমে সামনে এসেছে।
### রাজনীতি নয়, আলোচনার কেন্দ্রে শিল্প
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রায়ই খবরের শিরোনামে থাকে। তার মধ্যে করাচি থেকে আসা এই ভিডিওটি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটি মুহূর্ত দেখিয়েছে। এখানে কোনও রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে সামনে এসেছে একজন শিল্পীর কাজ এবং একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রস্তুতি।
একটি সাদা মূর্তিতে ধাপে ধাপে রং বসানো থেকে শুরু করে মুখাবয়ব ও অলংকারের সূক্ষ্ম কাজ—ভিডিওটির বড় অংশ জুড়েই রয়েছে শিল্পীর কারিগরি দক্ষতা। ফলে অনেক দর্শক ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে শিল্পীর কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
### সীমান্তের ওপারে উৎসবের অন্য ছবি
গণেশ চতুর্থীর আগে করাচির এই ভিডিও তাই নেটদুনিয়ায় আলাদা করে নজর কেড়েছে। একদিকে পাকিস্তানের মাটিতে বসবাসকারী একটি মারাঠি পরিবারের উৎসবের প্রস্তুতি, অন্যদিকে সেই প্রস্তুতিতে একজন মুসলিম শিল্পীর অংশগ্রহণের দাবি—দুটি বিষয় মিলেই তৈরি হয়েছে এই ভাইরাল মুহূর্ত।
তবে ভিডিওটির সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—গণেশমূর্তিতে রং করার শিল্পকর্মটি বহু দর্শকের নজর কেড়েছে। ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয় সীমান্তের বাইরে শিল্পের নিজস্ব ভাষা যে মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে, করাচির এই ভাইরাল ভিডিও তারই একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


