হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব গণেশ চতুর্থী। সিদ্ধিদাতা, বিঘ্নহর্তা এবং শুভবুদ্ধির দেবতা হিসেবে গণেশের আরাধনা করা হয় এই দিনে। ২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী পালিত হবে **১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার**। পঞ্জিকা অনুযায়ী, চতুর্থী তিথি ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৬ মিনিটে শুরু হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। গণেশের জন্মমুহূর্ত মধ্যাহ্নে বলে প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী ১৪ সেপ্টেম্বরই মূল পুজো করার কথা বলা হয়েছে।
গণেশ চতুর্থীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘরোয়া পুজোর পাশাপাশি বড় বড় মণ্ডপেও আয়োজন করা হয়। কোথাও দেড় দিন, কোথাও পাঁচ বা সাত দিন এবং কোথাও অনন্ত চতুর্দশী পর্যন্ত গণেশের আরাধনা চলে। ২০২৬ সালে অনন্ত চতুর্দশী পড়ছে ২৫ সেপ্টেম্বর।
## পুজোর আগে ঘর পরিষ্কার করা জরুরি
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, গণেশ পুজোর আগে বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুজোর জায়গা এবং রান্নাঘর ভালোভাবে পরিষ্কার করার কথা বলা হয়। রান্নাঘরে আগের দিনের বাসি খাবার রেখে না দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
গ্যাস, গ্যাসটেবিল বা রান্নার জায়গাও যেন অপরিচ্ছন্ন না থাকে, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়। এর পিছনে মূল ভাবনা হল—দেবতার আরাধনার আগে বাড়ি ও পুজোর পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও শুচি রাখা। সংবাদ প্রতিদিনের মূল প্রতিবেদনের তালিকাতেও এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
## স্নান করে শুদ্ধ মনে শুরু করুন পুজো
গণেশ চতুর্থীর সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পুজোর প্রস্তুতি নেওয়ার রীতি রয়েছে। অনেকে এই দিনে উপবাসও পালন করেন। তবে সবার শরীর উপবাসের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই সম্পূর্ণ নির্জলা বা কঠোর উপবাস না করে ফল, দুধ বা হালকা খাবার খাওয়ার রীতিও রয়েছে।
ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনের কথাও মাথায় রাখা জরুরি। অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ বা নিয়মিত ওষুধ খান এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপবাসের আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া উচিত।
## পুজোয় কোন রঙের সামগ্রী ব্যবহার করবেন?
প্রচলিত শাস্ত্রীয় মত অনুযায়ী, গণেশ পুজোয় **হলুদ রংকে শুভ** বলে মনে করা হয়। তাই হলুদ কাপড়, হলুদ সুতো বা হলুদ চন্দনের ব্যবহার করার রীতি রয়েছে।
অন্যদিকে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে গণেশ পুজোয় রুপোর বাসন কিংবা সাদা রঙের সামগ্রী ব্যবহার না করার একটি প্রচলিত বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই নিয়ম সব সম্প্রদায় বা অঞ্চলে একইভাবে পালন করা হয় না। তাই পারিবারিক রীতি বা স্থানীয় পুরোহিতের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
## অক্ষত চাল দিন, ভাঙা চাল নয়
হিন্দু পুজোর বিভিন্ন আচারে চাল গুরুত্বপূর্ণ উপাচার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গণেশ পুজোয় চাল দেওয়ার সময় **অক্ষত অর্থাৎ গোটা চাল** ব্যবহারের রীতি রয়েছে। ভাঙা চাল ব্যবহার না করার কথা বলা হয়।
ধর্মীয় বিশ্বাসে অক্ষতকে পূর্ণতা ও শুভতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই গণেশ পুজোর উপাচার সাজানোর সময় চাল বাছাইয়ের বিষয়টিও অনেকে গুরুত্ব দেন।
## অকারণে গাছের ডালপালা কাটবেন না
গণেশ চতুর্থীর দিনে অকারণে গাছের ডালপালা কাটা বা পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কাজ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটি একদিকে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
উৎসবের সময় সাজসজ্জা করতে গিয়ে যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাছপালা নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া উচিত। পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুজো আয়োজন করাই হতে পারে দায়িত্বশীল পথ।
## তুলসী পাতা নিয়ে রয়েছে বিশেষ বিশ্বাস
গণেশ পুজোয় কী কী দেওয়া যাবে, তা নিয়েও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথা রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, **তুলসী পাতা গণেশকে নিবেদন করা হয় না**। এর সঙ্গে গণেশ ও তুলসীকে ঘিরে একটি পৌরাণিক কাহিনি জড়িত বলে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।
তবে পুজোর উপাচার অঞ্চল, সম্প্রদায় এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই কোনও একটি নিয়মকে সর্বত্র একইভাবে প্রযোজ্য বলে না ধরে স্থানীয় রীতি অনুসরণ করাই শ্রেয়।
## গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ দেখা কেন নিষেধ?
গণেশ চতুর্থীর সঙ্গে চন্দ্রদর্শন নিষেধের একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। কথিত আছে, একবার চন্দ্রদেব গণেশের গজমুখ দেখে হাসাহাসি করেছিলেন। এতে গণেশ অপমানিত হন এবং চন্দ্রকে অভিশাপ দেন। সেই কাহিনির সূত্রেই গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ না দেখার রীতি প্রচলিত হয়েছে।
২০২৬ সালে বিভিন্ন পঞ্জিকা অনুযায়ী গণেশ চতুর্থীর দিনে নির্দিষ্ট সময় চন্দ্রদর্শন এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সঠিক সময় স্থানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করা ভালো।
## পুজোয় ভক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
গণেশ চতুর্থীর বিভিন্ন নিয়মের পিছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং আঞ্চলিক প্রথা। তাই কোনও নিয়ম পালন করতে গিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং ভক্তির সঙ্গে পুজো করাই উৎসবের মূল ভাবনা।
গণেশকে নতুন সূচনা, জ্ঞান, সমৃদ্ধি এবং বাধা দূর করার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই ১৪ সেপ্টেম্বর গণেশ চতুর্থীতে পুজোর আয়োজন করার সময় নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি উৎসবকে পরিবেশবান্ধব ও শান্তিপূর্ণ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।


