দুর্গাপুজো শুধু বাঙালির উৎসব নয়, এখন তা বাংলার অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক পরিচয়। কলকাতার পুজোর শিল্প, ঐতিহ্য, থিম, প্রতিমা এবং উৎসবের আবহ প্রতি বছরই দেশ-বিদেশের মানুষকে আকর্ষণ করে। সেই দুর্গাপুজোকেই আরও বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যে এবার বিশেষ উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে আদানি গোষ্ঠী। আর এই উদ্যোগের অন্যতম বড় চমক—দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ টুর’-এ বিশেষভাবে জায়গা দেওয়া হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের।
নবান্ন সূত্রে খবর, আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাব অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি প্রবীণ নাগরিককে কলকাতার বাছাই করা দুর্গাপুজো ঘুরিয়ে দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট অতিথিদের নিয়েও হবে বিশেষ ‘আদানি পুজো প্রিভিউ’। তিনদিন ধরে চলবে এই বিশেষ পরিক্রমা।
### ১০ অক্টোবর থেকেই শুরু ‘আদানি পুজো প্রিভিউ’
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর বিশেষ ‘আদানি পুজো প্রিভিউ’ শুরু হবে **১০ অক্টোবর**। এরপর ১১ এবং ১২ অক্টোবরও চলবে এই বিশেষ পরিক্রমা। অর্থাৎ মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হবে আয়োজনের এই বিশেষ পর্যায়।
সাধারণ দর্শনার্থীদের ঠাকুর দেখায় যাতে কোনওরকম সমস্যা তৈরি না হয়, সেই বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। মূল ভিড়ের সময়কে এড়িয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত নির্বাচিত পুজোগুলি পরিদর্শনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
### আটটি পুজো ঘুরবেন অতিথিরা
প্রথম পর্যায়ে কলকাতার **আটটি বাছাই করা দুর্গাপুজো** এই পরিক্রমার জন্য নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুজোগুলি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, একাধিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিমা, মণ্ডপের শিল্পসুষমা, বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং সামগ্রিক আয়োজন—এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই পুজো নির্বাচন করা হবে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ কলকাতার দুর্গাপুজোর শিল্প ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র্যকে দেশ-বিদেশের অতিথিদের সামনে তুলে ধরাই হবে এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
### প্রবীণদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব
প্রতি বছরই দুর্গাপুজোর সময় বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা অতিথিদের নিয়ে কলকাতার পুজো পরিক্রমা আয়োজন করে। তবে এই ধরনের অনুষ্ঠানে প্রবীণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এবার সেই জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে চাইছে আদানি গোষ্ঠী।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত উদ্যোগে প্রায় **১০ হাজারেরও বেশি প্রবীণ নাগরিককে** দুর্গাপুজো দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের শুধুমাত্র দর্শক হিসেবে নয়, এই বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিক্রমার অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
### শুধু প্রবীণ নন, থাকবেন দেশ-বিদেশের অতিথিরাও
এই বিশেষ পুজো পরিক্রমায় শুধু প্রবীণ নাগরিকরাই থাকবেন না। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকায় সরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, শিক্ষাবিদ, পড়ুয়া, কর্পোরেট কর্তাব্যক্তি এবং দুর্গাপুজোর আয়োজকদের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ থাকবেন। সব মিলিয়ে প্রায় **৫০ জন বিশিষ্ট অতিথি** থাকার কথা জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী।
### পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সহায়তার পরিকল্পনাও
এই উদ্যোগ শুধু অতিথিদের কলকাতার পুজো ঘুরিয়ে দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নির্বাচিত পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, **আদানি ফাউন্ডেশন** সরাসরি নির্বাচিত পুজোগুলিকে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। এর মাধ্যমে দুর্গাপুজোর আয়োজন, শিল্পকলা এবং স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
### ছোট ও মাঝারি শিল্পের উপকারের লক্ষ্য
আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবে দুর্গাপুজোকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে নয়, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সঙ্গেও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
গোষ্ঠীর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর মতো বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে কোটি কোটি দর্শনার্থীর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলিও যাতে লাভবান হয়, সেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পুজোকে ঘিরে পরিবহণ, খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প, সজ্জা, পরিষেবা-সহ একাধিক ক্ষেত্রের ব্যবসা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে এমন উদ্যোগের প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
### আগামী দিনে আরও বড় হওয়ার পরিকল্পনা
২০২৬ সালে প্রথম পর্যায়ে আটটি পুজোকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ পরিক্রমার পরিকল্পনা করা হলেও ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। আগামী বছরগুলিতে আরও বেশি দুর্গাপুজোকে এই উদ্যোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।
এর ফলে কলকাতার পুজোর বিভিন্ন ধারাকে আরও বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি অতিথিদের মাধ্যমে কলকাতার দুর্গাপুজোর শিল্প ও ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি প্রচার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### মহালয়া থেকেই জমজমাট পুজোর আবহ
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোকে ঘিরে কলকাতায় ইতিমধ্যেই একাধিক বড় আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। মহালয়াকে কেন্দ্র করে ইডেন গার্ডেন্সে বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে। তার সঙ্গে একই দিনে শুরু হতে পারে আদানির প্রস্তাবিত ‘পুজো প্রিভিউ’।
ফলে ১০ অক্টোবর থেকেই কলকাতায় পুজোর আবহ আরও তীব্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। একদিকে মহালয়ার অনুষ্ঠান, অন্যদিকে দেশ-বিদেশের অতিথিদের নিয়ে পুজো পরিক্রমা—সব মিলিয়ে ২০২৬-এর দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ দেওয়ার একাধিক উদ্যোগ সামনে আসছে।
### দুর্গাপুজোকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই লক্ষ্য
আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসছে বাংলার দুর্গাপুজোকে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরা। কলকাতার পুজোর শিল্প, ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা এবং মানুষের আতিথেয়তা দেশ-বিদেশের অতিথিদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবীণ নাগরিকদের এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রাখা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাধারণত বড় কর্পোরেট বা পর্যটনকেন্দ্রিক পুজো পরিক্রমায় তরুণ বা বিশিষ্ট অতিথিদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এবার ১০ হাজারেরও বেশি প্রবীণকে যুক্ত করার পরিকল্পনা সেই চেনা ছবিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তবে গোটা উদ্যোগটি বর্তমানে **রাজ্যের কাছে পেশ করা প্রস্তাব ও নবান্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে** সামনে এসেছে। চূড়ান্ত আয়োজন, অংশগ্রহণকারী পুজোর তালিকা এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি পরবর্তী পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হবে।


