বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল ডিরেক্টর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক জালিয়াতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিতর্ক এবং জমি সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটল। ২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক পদে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সায়মা। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে।
### কেন হঠাৎ পদত্যাগ সায়মার?
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সায়মা ওয়াজেদ বুধবার WHO-র ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসকে পদত্যাগপত্র পাঠান। দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্ত এবং WHO-র প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০২৫ সাল থেকেই তাঁকে বেতনহীন প্রশাসনিক ছুটিতে রাখা হয়েছিল। ফলে কার্যত তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না।
নিজের পদত্যাগপত্রে সায়মা WHO নেতৃত্বের উপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে দেওয়া হচ্ছিল না। পাশাপাশি প্রায় এক বছর ধরে বেতন না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি।
### কী কী অভিযোগ উঠেছে সায়মার বিরুদ্ধে?
সায়মার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছে। WHO-র তদন্তের মধ্যে ছিল চিন সফর সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই অভিযোগগুলিকে এখনও **প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই**। সায়মা নিজে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চিন সফরের খরচ সংক্রান্ত সমস্যাটি তাঁর এক সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০১ ডলার।
### শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক কী?
সায়মার বিরুদ্ধে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে WHO-কে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও ওঠে। বিশেষ করে তাঁর একটি সম্মানসূচক ডিগ্রি বা honorary doctorate নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে সায়মার দাবি, সেটি তাঁর গোপন করার বিষয় ছিল না। তিনি জানান, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ওই সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছিলেন এবং WHO-র শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর আইনজীবীরাও এই অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন।
### জমি নিয়েও উঠেছে অভিযোগ
সায়মার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি জমির প্লট বেআইনিভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগও তদন্তের অংশ হয়েছে। পদত্যাগপত্রে তিনি এই অভিযোগেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট জমিটি তিনি WHO-তে যোগ দেওয়ার আগেই পেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় ওই জমির অধিকার তাঁর ছিল। ওই আইনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য ছিল বলে সায়মা দাবি করেছেন।
অর্থাৎ জমি সংক্রান্ত বিষয়টিও এখন পর্যন্ত অভিযোগ ও পালটা দাবির পর্যায়েই রয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া কোনও পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
### ২০২৫ থেকেই WHO-তে ছুটিতে ছিলেন
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের গোড়ায় WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু পরের বছর থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের পর WHO তাঁকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়। পরে সেই ছুটি বেতনহীন ছুটিতে পরিণত হয়।
ফলে পদত্যাগের আগেই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি WHO-র গুরুত্বপূর্ণ পদে কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাঁর জায়গায় অন্তর্বর্তীভাবে WHO-র অন্য আধিকারিকরা দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন।
### শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বাড়তি নজর
সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার পর তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু হয়। সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও সায়মার ক্ষেত্রেও পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সায়মার WHO-র পদ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগগুলির তদন্তের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির আইনি অবস্থান স্পষ্ট করবে।
### WHO-তে নতুন রিজিওনাল ডিরেক্টর নির্বাচন
সায়মার পদত্যাগের পর এখন WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নতুন রিজিওনাল ডিরেক্টর নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন অক্টোবর মাসে হতে পারে। এরপর প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রিজিওনাল ডিরেক্টর বেছে নেওয়া হবে।
WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল ডিরেক্টর পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের একাধিক দেশের জনস্বাস্থ্য নীতি, সংক্রামক রোগের মোকাবিলা, স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি এবং WHO-র বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে এই দায়িত্ব সরাসরি যুক্ত।
### সায়মার রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের বড় মোড়
অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পর আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং তদন্ত তাঁর কর্মজীবনে বড় ধাক্কা তৈরি করে।
এখন পদত্যাগের মাধ্যমে WHO-র সঙ্গে তাঁর অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এবং বাংলাদেশে চলা আইনি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ ফলাফলই ঠিক করবে, এই বিতর্কের পরবর্তী অধ্যায় কীভাবে এগোয়। আপাতত সায়মার বক্তব্য স্পষ্ট—তিনি অভিযোগগুলি অস্বীকার করছেন এবং WHO নেতৃত্বের উপর আস্থা হারানোর কারণেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।


