দেশের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া হিসাব সামনে আসতেই বিজেপি ও কংগ্রেসের নির্বাচনী তহবিলের মধ্যে বড় ফারাক প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটপর্বে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরে প্রায় **₹১,৪৭২.৮ কোটি** রসিদ এসেছে। অন্যদিকে, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং পুদুচেরি—এই পাঁচ রাজ্যের কেন্দ্র ও রাজ্য ইউনিট মিলিয়ে কংগ্রেসের নিট রসিদ ছিল **₹২০৭.১৭ কোটি**। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের হিসাবে বিজেপির রসিদ কংগ্রেসের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি।
### কোন সময়ের হিসাব সামনে এল?
নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া এই হিসাব মূলত **১৫ মার্চ থেকে ৬ মে ২০২৬** পর্যন্ত নির্বাচনী সময়ের। এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে।
কংগ্রেসের ক্ষেত্রে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী হিসাব একত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দলটি ওই সময়ে ₹২০৭.১৭ কোটি নিট রসিদ দেখিয়েছে এবং মোট নির্বাচনী খরচের পরিমাণ জানিয়েছে **₹২৪৮.৫৫ কোটি**। অর্থাৎ নির্বাচনী সময়ে কংগ্রেসের খরচ তার নিট রসিদের চেয়েও বেশি ছিল।
অন্যদিকে বিজেপির ক্ষেত্রে এখনও সব রাজ্যের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি। বর্তমানে যে নথিগুলি পাওয়া গিয়েছে, তাতে অসম, তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরির নির্বাচনী হিসাব রয়েছে। ফলে বিজেপির মোট রসিদের অঙ্ক ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
### বিজেপির রসিদ প্রায় দেড় হাজার কোটি
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বিজেপির নির্বাচনী খরচের বিবরণ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় দফতরে এই নির্বাচনী পর্বে **₹১,৪৭২.৮ কোটি** রসিদ এসেছে। এই অঙ্কটি কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সদর দফতরের হিসাব।
অর্থাৎ রাজ্য ও জেলা স্তরের সংগঠনের সম্ভাব্য অন্যান্য রসিদ এই ₹১,৪৭২.৮ কোটির মধ্যে ধরা হয়নি। ফলে বিজেপির সামগ্রিক নির্বাচনী তহবিলের প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে কংগ্রেসের ₹২০৭.১৭ কোটির হিসাবটি কেন্দ্রীয় ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য ইউনিটগুলিকে একসঙ্গে ধরে তৈরি। ফলে দুই দলের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করার সময় হিসাবের পরিধির এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
### কংগ্রেসের নিট রসিদ ₹২০৭ কোটি
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কংগ্রেসের consolidated election expenditure report অনুযায়ী, পাঁচ রাজ্যের ভোটপর্বে দলের নিট রসিদ ছিল **₹২০৭.১৭ কোটি**। একই সময়ে দলের নির্বাচনী খরচ হয়েছে **₹২৪৮.৫৫ কোটি**।
অর্থাৎ ভোটের সময় কংগ্রেসের আর্থিক ভাণ্ডারে যে পরিমাণ অর্থ এসেছে, তার তুলনায় খরচের পরিমাণ বেশি ছিল। নির্বাচনী পর্বের শুরুতে কেন্দ্র ও পাঁচ রাজ্য ইউনিট মিলিয়ে দলের হাতে প্রায় ₹১৬৯.০৬ কোটি ছিল। ভোটপর্ব শেষে সেই অঙ্ক কমে প্রায় ₹১০৩.২ কোটিতে দাঁড়ায়।
### বিজেপির খরচ কোথায়?
বিজেপির ক্ষেত্রেও শুধু টাকা পাওয়ার অঙ্ক নয়, কোথায় কত খরচ হয়েছে সেটিও নজর কেড়েছে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, অসম, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে বিজেপি মোট প্রায় **₹১৬০ কোটি** খরচের হিসাব দিয়েছে।
এর মধ্যে অসমে খরচ হয়েছে প্রায় **₹৯৬.৩ কোটি**। তামিলনাড়ুতে খরচ হয়েছে **₹৫১.৬ কোটি** এবং পুদুচেরিতে প্রায় **₹১১.৯ কোটি**। অর্থাৎ তিনটি রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে অসমেই বিজেপির নির্বাচনী ব্যয় সবচেয়ে বেশি।
### প্রচারে সবচেয়ে বেশি টাকা
বিজেপির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এই তিন জায়গার নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ গিয়েছে দলীয় প্রচারে। প্রায় **₹১৩০.৪ কোটি** খরচ হয়েছে সাধারণ দলীয় প্রচার ও প্রচারমূলক কার্যক্রমে।
আর প্রায় **₹২৯.৬ কোটি** দেওয়া হয়েছে প্রার্থীদের এককালীন অর্থ এবং প্রার্থীদের অপরাধমূলক অতীত সম্পর্কিত তথ্য প্রচারের মতো খাতে।
অসমের হিসাব আরও বিস্তারিতভাবে দেখলে দেখা যায়, সেখানে সাধারণ দলীয় প্রচারে প্রায় ₹৭৬.৭ কোটি খরচ হয়েছে। তার মধ্যে কেন্দ্রীয় ইউনিটের খরচও রয়েছে। এছাড়া তারকা প্রচারকদের যাতায়াত, বিজ্ঞাপন এবং প্রচারসামগ্রীতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে।
### ভোট শেষে বিজেপির তহবিল আরও বাড়ল
নির্বাচনী সময়ে বিপুল অঙ্কের রসিদ পাওয়ার পাশাপাশি বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের ক্লোজিং ব্যালান্সও বেড়েছে। ১৫ মার্চ ২০২৬-এ দলের কেন্দ্রীয় দফতরের ব্যালান্স ছিল প্রায় **₹৬,৭২২.৬ কোটি**।
৬ মে ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর সেই ব্যালান্স বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় **₹৭,৬২৭.২ কোটি**। অর্থাৎ নির্বাচনী সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় দফতরের ব্যালান্স প্রায় **₹৯০৪.৬ কোটি** বেড়েছে।
এখানে অবশ্য ব্যালান্স বৃদ্ধি মানেই পুরো অর্থ নতুন করে অনুদান হিসেবে এসেছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আয়, ব্যয় এবং পূর্ববর্তী সঞ্চিত অর্থের হিসাব মিলিয়েই ক্লোজিং ব্যালান্স তৈরি হয়।
### পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলের হিসাব এখনও বাকি
এই পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল—বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ও কেরল বিধানসভা নির্বাচনের পূর্ণ নির্বাচনী খরচের রিপোর্ট এখনও নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নথিতে আসেনি।
তাই বর্তমানে ₹১,৪৭২.৮ কোটি যে অঙ্কটি দেখা যাচ্ছে, সেটিকে বিজেপির পাঁচ রাজ্যের **চূড়ান্ত মোট রসিদ** বলা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরলের হিসাব প্রকাশিত হলে বিজেপির সামগ্রিক নির্বাচনী অর্থের ছবি আরও পরিষ্কার হবে।
### ‘সাত গুণ’ তুলনাটি কতটা সরাসরি?
খবরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিজেপির রসিদ কংগ্রেসের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি হওয়ার বিষয়টি। সংখ্যার হিসাবে ₹১,৪৭২.৮ কোটি বনাম ₹২০৭.১৭ কোটি—এই ব্যবধান সত্যিই সাত গুণের বেশি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। বিজেপির ₹১,৪৭২.৮ কোটি হল **কেন্দ্রীয় দফতরে পাওয়া রসিদ**, যেখানে কংগ্রেসের ₹২০৭.১৭ কোটি হল **কেন্দ্র ও রাজ্য ইউনিট মিলিয়ে নিট রসিদ**। অর্থাৎ দুই দলের রিপোর্টের কাঠামো এক নয়। এই কারণে এই সংখ্যাগুলিকে সরাসরি ‘সমান ভিত্তির অনুদান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
### নির্বাচনী অর্থনীতিতে বড় ছবি
তবু এই হিসাব দেশের দুই প্রধান জাতীয় দলের নির্বাচনী অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়। বিজেপির কেন্দ্রীয় সংগঠনের হাতে থাকা বিপুল তহবিল নির্বাচনী প্রচার, বিজ্ঞাপন, জনসভা, যাতায়াত এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে বড় পরিসরে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে কংগ্রেসের হিসাব দেখাচ্ছে, একই নির্বাচনী সময়ে দলকে তুলনামূলকভাবে সীমিত আর্থিক সম্পদের মধ্যে প্রচার চালাতে হয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ রাজ্যের ভোটে ₹২৪৮.৫৫ কোটি খরচের বিপরীতে ₹২০৭.১৭ কোটি নিট রসিদ থাকার বিষয়টি দলের আর্থিক চাপের ছবিও তুলে ধরে।
### রাজনৈতিক দলগুলির অর্থের উৎস নিয়ে ফের প্রশ্ন
এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী অর্থের উৎস নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। নির্বাচনী ব্যয়, অনুদান, কর্পোরেট অর্থ এবং রাজনৈতিক দলগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা—এই বিষয়গুলি বহু বছর ধরেই ভারতের রাজনীতিতে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া এই হিসাব দেখে কোনও দলের অনুদান বেআইনি বা কোনও নির্দিষ্ট দাতার অর্থ সন্দেহজনক—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। রাজনৈতিক দলের বৈধ আর্থিক রসিদ এবং নির্বাচনী খরচের হিসাব নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে জমা পড়ে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের হিসাব বিজেপি ও কংগ্রেসের নির্বাচনী অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান সামনে এনেছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরে ₹১,৪৭২.৮ কোটি রসিদ এবং কংগ্রেসের কেন্দ্র-রাজ্য মিলিয়ে ₹২০৭.১৭ কোটি নিট রসিদ—এই দুই সংখ্যা এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলের হিসাব প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত ছবিটি সম্পূর্ণ নয়।


