পশ্চিম এশিয়ায় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, ঠিক সেই সময় কূটনৈতিক বার্তায় দেখা গেল একেবারে বলিউডি মশকরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করতে বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমারের জনপ্রিয় সিনেমার দৃশ্য ব্যবহার করে একটি মিম প্রকাশ করেছে ইরানের তিউনিসিয়া দূতাবাস। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত সেই পোস্ট ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে নেটিজেনদের। কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও এমন মিম-ভিত্তিক বার্তা যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল ডিপ্লোমেসি’র উদাহরণ হয়ে উঠছে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
### অক্ষয় কুমারের কোন দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে?
ইরানের তিউনিসিয়া দূতাবাসের অফিসিয়াল X হ্যান্ডল ‘I.R. Iran in Tunisia’ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর একটি মিম পোস্ট করা হয়। সেখানে অক্ষয় কুমারের ‘হে বেবি’ সিনেমার একটি দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিতে অভিনেতার মজার অভিব্যক্তিকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গাত্মক বার্তা দেওয়া হয়।
মিমটির বক্তব্যের সারমর্ম ছিল—একদিকে একটি মার্কিন ডুবোযান হারিয়েছে, অন্যদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, তার উপর সামনে নির্বাচন। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের উদ্দেশে প্রশ্ন, “কী খবর ট্রাম্প?” এই ব্যঙ্গাত্মক বার্তার সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয় অক্ষয় কুমারের হাস্যরসাত্মক মুখভঙ্গি।
### কেন অক্ষয় কুমারের মিম?
অক্ষয় কুমারের বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্য বহু বছর ধরেই ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম সংস্কৃতির জনপ্রিয় উপাদান। তাঁর নানা অভিব্যক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক মন্তব্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের রসিকতা—বিভিন্ন ধরনের মিম তৈরি হয়েছে। এবার সেই ভারতীয় মিম সংস্কৃতিকেই কূটনৈতিক বার্তার অংশ করে নিল ইরানের তিউনিসিয়া দূতাবাস।
ফলে বিষয়টি শুধু ইরান-আমেরিকা সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতীয় সিনেমার একটি পরিচিত মুখও আচমকা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গের অংশ হয়ে গিয়েছেন। ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের একাংশও এই মিম নিয়ে মজার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
### ডুবোযান নিয়ে কী দাবি করেছে ইরান?
মিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হল মার্কিন ডুবোযান। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড দাবি করেছে, ৮ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে তারা একটি মার্কিন স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান আটক করেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি ছিল একটি **Dive-LD unmanned underwater vehicle**, যা California-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা সংস্থা Anduril তৈরি করেছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ইরান ও আমেরিকার বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইরান ঘটনাটিকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরনো মডেলের ওই স্বয়ংক্রিয় ডুবোযানটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হারিয়ে যায়। মার্কিন পক্ষের দাবি, সেটিতে শ্রেণিবদ্ধ তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ গোপন সামরিক ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ‘ইরান মার্কিন সাবমেরিন দখল করেছে’—এমন সরলীকরণ না করে ঘটনাটিকে একটি মার্কিন unmanned underwater vehicle হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখা বেশি নির্ভুল।
### তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি কেন?
ইরানের মিমে তেলের দাম নিয়েও কটাক্ষ করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভয়াবহ অস্থিরতা। এই জলপথ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
Reuters-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, Brent crude-এর দাম ১০০ ডলারের উপরে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং একের পর এক জাহাজে হামলার খবর বাজারে সরবরাহ-সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
### পালটা হামলায় আরও বাড়ছে উত্তেজনা
৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন সেনাবাহিনী পাঁচটি ইরানি তেলের ট্যাঙ্কার ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। আমেরিকার দাবি, এর আগে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এরপরই ওই ট্যাঙ্কারগুলির বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান হয়।
এর পালটা হিসেবে ইরান মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং জাহাজকে আক্রমণ করার দাবি করেছে। এমনকী জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে উপসাগরীয় জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
### মিমে রাজনীতির নতুন ভাষা
ইরানের তিউনিসিয়া দূতাবাসের এই পোস্ট দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা কতটা বদলে গিয়েছে। আগে রাষ্ট্র বা দূতাবাসের রাজনৈতিক বার্তা মানেই ছিল দীর্ঘ বিবৃতি, কূটনৈতিক শব্দচয়ন কিংবা সরকারি বিজ্ঞপ্তি। এখন সেই জায়গায় কখনও কখনও মিম, সিনেমার দৃশ্য এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিও ঢুকে পড়ছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে দ্রুত পৌঁছতে মিম অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। অক্ষয় কুমারের পরিচিত মুখভঙ্গি ব্যবহার করে ইরানের দূতাবাস যে বার্তা দিয়েছে, তার মূল লক্ষ্য যে হাস্যরসের মাধ্যমে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে কটাক্ষ করা—তা স্পষ্ট।
### নেটদুনিয়ায় কেন ভাইরাল?
পোস্টটি প্রকাশের পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ভারতীয় মিম সংস্কৃতির ব্যবহার নিয়েই বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী ভারতীয় মিমকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও সৃজনশীল মিম সংস্কৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাতের খবরের মধ্যেও বলিউডের পরিচিত মুখ অক্ষয় কুমার নতুন করে আলোচনায় চলে এসেছেন।
তবে মিমটি নিছক বিনোদনের পোস্ট নয়। এর মধ্যে ইরানের রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। তেল, হরমুজ প্রণালী, মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং আসন্ন নির্বাচন—এই সবকিছুকে একসঙ্গে জুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ব্যঙ্গ করাই পোস্টটির মূল উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


