দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একই সঙ্গে সংস্কৃতি, আবেগ, পরিবার এবং খাদ্যাভ্যাসেরও উৎসব। পুজোর পাঁচটি দিন ঘিরে যেমন মণ্ডপে দেবীর আরাধনা হয়, তেমনই বাড়িতে চলে খাওয়াদাওয়া, আড্ডা এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পর্ব। আর সেই খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম কিংবা অন্যান্য আমিষ পদও বহু বাঙালি পরিবারের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত অংশ।
এই প্রেক্ষাপটেই দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খাবার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খাবার থেকে বিরত থাকার আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি পুজোমণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি বা পরিবেশন না করার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরেই শুরু হয়েছে ধর্মীয় বিধি বনাম বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে তর্ক।
## নবরাত্রির নিয়ম কি বাংলাতেও প্রযোজ্য?
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্যের মূল ভিত্তি নবরাত্রির সেই খাদ্যসংস্কৃতি, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মানুষ নবরাত্রির সময়ে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন। কিন্তু ভারতের ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল বৈচিত্র্য। একই দেবীর আরাধনা হলেও অঞ্চলভেদে পুজোর পদ্ধতি, মন্ত্র, ভোগ এবং খাদ্যাভ্যাসে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
বাংলায় দুর্গাপুজোর আচারও সেই বৈচিত্র্যেরই অংশ। কোথাও নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়, কোথাও দেবীর উদ্দেশে মাছ নিবেদনের ঐতিহ্য রয়েছে, আবার কোথাও বলির প্রচলন থেকে মাংস প্রসাদ হিসেবে গ্রহণের রীতিও দেখা যায়। ফলে গোটা দেশের একটি নির্দিষ্ট খাদ্যরীতি বাংলার প্রতিটি পুজোয় বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন ধারণা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
## বাঙালির পুজো মানেই মাছ-মাংস?
এখানেই আসল সাংস্কৃতিক প্রশ্ন। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মাছের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজোর সময় বহু পরিবারে ইলিশ, চিংড়ি, কাতলা, মাংস কিংবা অন্যান্য আমিষ পদ রান্না করা হয়। এটি কোনও নতুন প্রবণতা নয়; বরং পারিবারিক ও আঞ্চলিক রীতির সঙ্গে বহুদিন ধরে জড়িয়ে থাকা খাদ্যসংস্কৃতি।
সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা পালও মন্তব্য করেছেন যে বাঙালিরা সারা বছর দুর্গাপুজোর জন্য অপেক্ষা করেন এবং এই সময়ে ইলিশ, চিংড়ি কিংবা মটনের মতো খাবার উপভোগ করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ও এই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িত।
অর্থাৎ, কারও কাছে দুর্গাপুজো কঠোর নিরামিষাচারের সময় হতে পারে, আবার অন্যের কাছে পুজোর আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে মাছ-মাংস। দুটো অভিজ্ঞতাই একই সমাজে সহাবস্থান করতে পারে।
## পুজোর পবিত্রতা কি খাবারের উপর নির্ভর করে?
এই প্রশ্নটিই সম্ভবত বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ধর্মীয় পবিত্রতার ধারণা ব্যক্তিভেদে এবং সম্প্রদায়ভেদে আলাদা। কেউ মনে করেন, দেবীর সামনে সম্পূর্ণ নিরামিষ পরিবেশ থাকা উচিত। আবার কেউ মনে করেন, ভক্তি ও নিষ্ঠাই পুজোর মূল বিষয়; খাদ্যাভ্যাস তার ব্যক্তিগত অংশ।
সুতরাং কোনও নির্দিষ্ট পুজো কমিটি যদি নিজেদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগের সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি তাদের অধিকার। একইভাবে কোনও পরিবার যদি নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী আমিষ রান্না করে, সেটিকেও শুধুমাত্র অন্য একটি খাদ্যরীতির সঙ্গে না মেলার কারণে ‘অধর্ম’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
## বাঙালির ধর্মীয় ঐতিহ্য একরকম নয়
বাংলার শাক্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মা কালী, দুর্গা বা বিভিন্ন শক্তিপীঠকে কেন্দ্র করে অঞ্চলভেদে নানা রীতি প্রচলিত রয়েছে। কোথাও বলি হয়, কোথাও সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়, কোথাও আবার মাছ দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করার রীতি রয়েছে।
এই বহুত্বই বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই ‘দুর্গাপুজো মানেই নিরামিষ’ অথবা ‘দুর্গাপুজো মানেই আমিষ’—দুই ধরনের একরৈখিক সিদ্ধান্তই বাস্তবতার সম্পূর্ণ ছবি তুলে ধরে না।
ধর্মীয় আচারের এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করাই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ধর্মের মধ্যেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা আঞ্চলিক রীতি তৈরি হয়েছে।
## ‘আমিষ বন্ধ করুন’—কতটা ব্যক্তিগত মত, কতটা নির্দেশ?
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যের পর যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হল—একজন ধর্মগুরুর আবেদন কি কোনও রাজ্য বা সম্প্রদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশ হয়ে উঠতে পারে?
এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করার কোনও সাধারণ নির্দেশিকা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি মূলত ধর্মীয় মতামত ও সামাজিক বিতর্কের স্তরেই রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোয় ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসও ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও প্রকাশ্যে বলেছেন, কোনও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বাংলায় এসে মানুষ কী খাবেন বা কী পরবেন, তা নির্দেশ দিতে পারেন না। তাঁর বক্তব্যেও বাঙালির নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির স্বাধীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
## বিতর্কের মধ্যে আসল বিষয়—সহাবস্থান
দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য এখানেই যে একই উৎসবকে মানুষ নানা ভাবে উদযাপন করেন। কেউ উপবাস করেন, কেউ নিরামিষ খান, কেউ মাছ-মাংস খান। কেউ মন্ত্রপাঠে সময় কাটান, কেউ প্যান্ডেল ঘুরে উৎসব উপভোগ করেন। কারও কাছে পুজো নিখাদ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আবার কারও কাছে সেটিই বাঙালির সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব।
এই পার্থক্যকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে সহাবস্থানের জায়গা তৈরি করাই বেশি জরুরি।
কারও ধর্মীয় বিশ্বাস যদি তাঁকে নিরামিষ থাকতে বলে, তিনি অবশ্যই তা পালন করবেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস অন্যের প্লেটে কী থাকবে, তা নির্ধারণ করবে কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন।
## বাঙালির পুজো বাঙালির মতোই থাকুক
দুর্গাপুজোকে আরও ‘শুদ্ধ’ করার নামে যদি বাংলার নিজস্ব লোকাচার, খাদ্যসংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে এক ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হয়, তাহলে উৎসবটির বহুত্বই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে এটাও সত্যি যে পুজোমণ্ডপে খাবার বিক্রি বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পবিত্রতার বিষয়ে কোনও কমিটি নিজস্ব নিয়ম তৈরি করতেই পারে। কিন্তু সেই নিয়মকে গোটা বাংলার মানুষের জন্য ধর্মীয় বিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
দুর্গাপুজো বাঙালির। সেই পুজোয় নিরামিষও থাকবে, আমিষও থাকবে—যে পরিবার যে ভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পালন করে এসেছে, তারা সে ভাবেই পালন করবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন অন্যের ব্যক্তিগত পছন্দ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিও সম্মান।
শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর আসল শক্তি কোনও একটি খাবারের তালিকায় নয়—**বৈচিত্র্যের মধ্যে একসঙ্গে উৎসব করার ক্ষমতায়।**


