পশ্চিমবঙ্গে সদ্য বিধানসভা নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের ভোটের দামামা। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের ঘোষণা হয়েছে। আগামী **৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনা**। আর তার আগেই এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
এই আবহেই তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—মমতা যদি সত্যিই রাজনৈতিক লড়াইয়ে আত্মবিশ্বাসী হন, তাহলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনেই প্রার্থী হয়ে লড়াই করুন। সজলের এই মন্তব্য ঘিরে বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
## নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে কেন উপনির্বাচন?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর দুই কেন্দ্রেই আসন শূন্য হয়েছে। নন্দীগ্রামে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে রেজিনগর থেকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর জয় পান। দুই কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই একাধিক আসনে জয় পাওয়ার পর বিধায়করা একটি আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় দুই কেন্দ্রেই একই দিনে ভোট হবে। ফলে পুজোর আগে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে ফের বড়সড় নির্বাচনী লড়াই দেখা যেতে চলেছে।
## মমতাকে কেন চ্যালেঞ্জ সজলের?
সজল ঘোষের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের দিকে তাকাতে হবে। এবারের ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেখানে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী।
ফলাফলে শুভেন্দু মমতাকে **১৫,১০৫ ভোটে পরাজিত** করেন। একই নির্বাচনে নন্দীগ্রামেও শুভেন্দু জয়ী হন। ফলে মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধী শিবিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, সজলের চ্যালেঞ্জ সেই রাজনৈতিক আবহেরই অংশ।
সজলের বক্তব্য তাই শুধু ব্যক্তিগত কটাক্ষ নয়; এর মধ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে মমতার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্ন করার বার্তাও রয়েছে।
## ‘দুটো কেন্দ্রেই প্রার্থী হন’, বার্তা সজলের
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সজল ঘোষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—মমতা যদি মনে করেন তাঁর রাজনৈতিক জনভিত্তি এখনও অটুট, তাহলে কঠিন দুই কেন্দ্রের যেকোনও একটিতে বা দু’টিতেই লড়াই করে তা প্রমাণ করুন।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এটি **সজল ঘোষের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ**, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ঘোষিত নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নয়। ফলে মমতা আদৌ এই উপনির্বাচনে প্রার্থী হবেন কি না, তা এই বক্তব্যের ভিত্তিতে ধরে নেওয়া যায় না।
## মমতার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ দুই কেন্দ্র?
নন্দীগ্রাম মমতার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকেই তিনি শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শুভেন্দু জয়ী হন। সেই পরাজয়ের পর মমতা ভবানীপুরে ফিরে উপনির্বাচনে জয় পান।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ফের শুভেন্দুর কাছে পরাজয় মমতার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এবার নন্দীগ্রাম আসনটি ফের উপনির্বাচনের মুখে। তাই মমতা সেখানে প্রার্থী হলে তা নিছক একটি উপনির্বাচন থাকবে না—রাজনৈতিক মর্যাদার লড়াইয়েও পরিণত হতে পারে।
## রেজিনগরের অঙ্ক আবার আলাদা
রেজিনগরের রাজনৈতিক সমীকরণ নন্দীগ্রামের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে হুমায়ুন কবীর এই কেন্দ্র থেকে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। পরে আসন ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে ফের ভোট হচ্ছে।
এই কেন্দ্রে বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ভোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী ভোট ভাগ হলে কোন দল সুবিধা পাবে, সেটাই নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রেজিনগরে লড়ার চ্যালেঞ্জ দিয়ে সজল ঘোষ কার্যত তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।
## সজল ঘোষ নিজেও এখন বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ মুখ
সজল ঘোষের নিজের রাজনৈতিক উত্থানও সাম্প্রতিক সময়ে নজর কেড়েছে। ২০২৪ সালের বরানগর উপনির্বাচনে তিনি তৃণমূলের সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের বরানগর থেকেই লড়ে সায়ন্তিকাকে হারিয়ে বিধায়ক হন।
নির্বাচন কমিশনের ফলাফলের হিসাবে, ২০২৬ সালে বরানগরে সজল ঘোষ **৮১,৭৩০ ভোট** পেয়েছেন, যেখানে সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় পান **৬৪,৭৯১ ভোটের কাছাকাছি**। অর্থাৎ আগের পরাজয়ের পর তিনি সেই কেন্দ্রেই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
এই জয়ের পর দলের ভিতরে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। ফলে মমতাকে নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক আক্রমণও রাজনৈতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে।
## উপনির্বাচনে বিজেপির সামনে বড় পরীক্ষা
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই উপনির্বাচন বিজেপির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর এই দুই কেন্দ্রে ভোট হবে নতুন সরকারের প্রথম দিকের রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলির একটি।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামে বিজেপি আগেই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী জয়ী হওয়ায় সেই আসনে বিজেপির সংগঠন কতটা কার্যকর, তা ফের যাচাই হবে। অন্যদিকে রেজিনগরে বিজেপিকে একেবারে নতুন সমীকরণের সঙ্গে লড়তে হবে।
## তৃণমূলের সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
তৃণমূলের জন্যও এই উপনির্বাচন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সদ্য বিধানসভা নির্বাচনে দলের ফল প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ হওয়ার পর দুই কেন্দ্রের ফলাফল নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামে তৃণমূল যদি শক্তিশালী ফল করতে পারে, তাহলে দলের কর্মী-সমর্থকদের কাছে তা মনোবল বাড়ানোর বার্তা হবে। বিপরীতে বিজেপি জয় ধরে রাখতে পারলে রাজ্যে তাদের সাংগঠনিক আধিপত্যের দাবিই আরও জোরালো হবে।
## ৬ অক্টোবরের ভোটেই মিলবে জবাব
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন তাই এখন আর শুধুমাত্র দুটি বিধানসভা আসনের ভোট নয়। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধীদের আক্রমণ, অন্যদিকে বিজেপির সদ্য ক্ষমতায় আসার পর জনসমর্থন ধরে রাখার পরীক্ষা—সব মিলিয়ে দুই কেন্দ্রের ভোটের গুরুত্ব বেড়েছে।
সজল ঘোষের চ্যালেঞ্জ মমতা গ্রহণ করবেন কি না, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে তাঁর মন্তব্যের ফলে উপনির্বাচনের প্রচারের আগেই রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটের ময়দানে কোন দল কতটা শক্তি দেখাতে পারে, তার উত্তর মিলবে **৬ অক্টোবরের ভোটে এবং ৯ অক্টোবরের গণনায়**।


