পশ্চিমবঙ্গের দুই গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র রেজিনগর ও নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পরই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জল্পনা শুরু হয়েছে। তার মধ্যেই বিজেপিকে রুখতে বিরোধী দলগুলিকে একজোট হওয়ার ডাক দিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীরা নিজেদের ‘ইগো’ দূরে সরিয়ে এক টেবিলে বসতে পারলে বিজেপির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই দেওয়া সম্ভব।
হুমায়ুনের এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রেজিনগর তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই কেন্দ্র থেকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী হিসেবে **১,২৩,৫৩৬ ভোট** পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। একইসঙ্গে নওদা থেকেও জয় পান তিনি। পরে নিয়ম মেনে রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছে।
## মমতা-সেলিম-নওশাদকে এক টেবিলে বসার বার্তা
মঙ্গলবার নিজের দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক বৈঠকে হুমায়ুন কবীর বিরোধী ঐক্যের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল—বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম এবং আইএসএফ-সহ বিরোধীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
হুমায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিরোধী শিবিরের হাতে থাকা ৮৬ জন বিধায়ক যদি নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে একজোট হন, তাহলে বিজেপিকে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে তিনি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী, আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকী এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেন।
তবে তাঁর এই আহ্বান এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী জোটের ঘোষণা নয়। বরং বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগাভাগি আটকাতে বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে—এই রাজনৈতিক অবস্থানই তুলে ধরেছেন তিনি।
## রেজিনগরে কংগ্রেসের অবস্থান কী?
হুমায়ুনের মহাজোটের প্রস্তাবের সঙ্গে রেজিনগর নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানেরও সংঘাত তৈরি হতে পারে। কারণ রেজিনগর আসনটি কংগ্রেসকে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে আগেই সওয়াল করেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। তাঁর যুক্তি ছিল, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে মোকাবিলা করতে কংগ্রেসকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কিন্তু কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, রেজিনগরে কংগ্রেস নিজেদের শক্তিতেই লড়াই করবে। ফলে হুমায়ুনের প্রস্তাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
## নিজের ছেলেকে প্রার্থী করার ঘোষণা
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই রেজিনগর উপনির্বাচনে নিজের ছেলেকে প্রার্থী করার কথা জানিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। অর্থাৎ একদিকে নিজের দলের প্রার্থীকে জেতানোর প্রস্তুতি, অন্যদিকে অন্য বিরোধী দলগুলিকে এক মঞ্চে আসার আহ্বান—দুই সমান্তরাল রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছেন তিনি।
এই অবস্থান নিয়েই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, রেজিনগরের মতো নিজের শক্ত ঘাঁটিতে কি এবার লড়াইকে তিনি আগের তুলনায় কঠিন মনে করছেন? যদিও ‘ভয় পেয়েছেন’—এমন মন্তব্যকে হুমায়ুনের বক্তব্যের সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবে ধরা যায় না। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি ছিল বিজেপি-বিরোধী ভোটকে এক জায়গায় আনা।
## ২০২৬-এর ভোটে বড় ব্যবধানে জয় হুমায়ুনের
রেজিনগরের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল অবশ্য হুমায়ুনের শক্তির ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর ১,২৩,৫৩৬ ভোট পান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির বাপন ঘোষ পান ৬৪,৬৬০ ভোট। তৃণমূলের প্রার্থী আতাউর রহমান পান ৪১,৭১৮ ভোট। অর্থাৎ হুমায়ুন প্রায় **৫৮,৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে** জয়ী হন।
এই ফলাফলের পর রেজিনগরে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়। কিন্তু উপনির্বাচনে সমীকরণ বদলে যেতে পারে, কারণ এবার লড়াইয়ে প্রার্থী, স্থানীয় সংগঠন এবং দলগুলির পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
## ৬ অক্টোবর ভোট, ৯ অক্টোবর ফল
নির্বাচন কমিশন রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম—দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছে। **৬ অক্টোবর ২০২৬ ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনা ও ফলপ্রকাশ** হবে।
ফলে হাতে খুব বেশি সময় নেই। রাজনৈতিক দলগুলিকে দ্রুত প্রার্থী নির্বাচন, সংগঠন গোছানো এবং প্রচারের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই পরিস্থিতিতে হুমায়ুনের মহাজোটের ডাক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
## নন্দীগ্রামেও কি বিরোধী ঐক্যের পরীক্ষা?
হুমায়ুনের বক্তব্য শুধু রেজিনগরে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য হল—বিজেপিকে আটকাতে বিরোধীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনেও বিরোধী ভোট ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে দুই কেন্দ্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। রেজিনগরে হুমায়ুনের ব্যক্তিগত সংগঠন ও সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে নন্দীগ্রাম রাজ্যের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক কেন্দ্র। ফলে সেখানে প্রার্থী নির্বাচন ও বিরোধী ভোটের সমীকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## আনুষ্ঠানিক জোট হবে কি?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাব কি বাস্তবে কোনও নির্বাচনী সমঝোতায় রূপ নেবে?
এই মুহূর্তে তেমন কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের খবর নেই। কংগ্রেস রেজিনগরে নিজেদের শক্তিতে লড়ার কথা জানিয়েছে। তৃণমূল, বাম এবং আইএসএফের মধ্যেও এমন কোনও আনুষ্ঠানিক আসন সমঝোতা ঘোষণা হয়নি। ফলে হুমায়ুনের বক্তব্য আপাতত রাজনৈতিক আহ্বান হিসেবেই থাকছে।
তবে উপনির্বাচনের আগে এই বক্তব্য বিরোধী শিবিরের অঙ্ককে যে আরও আলোচনায় আনবে, তা স্পষ্ট। কারণ একদিকে বিজেপির সংগঠন, অন্যদিকে তৃণমূল-কংগ্রেস-বাম-আইএসএফের ভোটের সম্ভাব্য বিভাজন—সব মিলিয়ে দুই কেন্দ্রেই লড়াই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
## নজরে রেজিনগরের ভোটের অঙ্ক
রেজিনগরের উপনির্বাচনে তাই শুধু কে প্রার্থী হচ্ছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন দল কার বিরুদ্ধে লড়ছে, বিরোধী ভোট কতটা ভাগ হচ্ছে এবং স্থানীয় স্তরে কোন দলের সংগঠন কতটা সক্রিয়—এই সবকটি বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
হুমায়ুন কবীরের মহাজোটের ডাক সেই ভোটের অঙ্কেই নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর নিজের দলের প্রার্থীকে সামনে রেখে একইসঙ্গে বিরোধীদের ঐক্যের আহ্বান কতটা কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
অক্টোবরের ভোটের আগে রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম—দুই কেন্দ্রেই তাই প্রার্থী ঘোষণা থেকে জোটের সমীকরণ, প্রচারের ভাষা থেকে ভোটের মেরুকরণ—সবকিছুর উপরেই নজর থাকবে। শেষ পর্যন্ত হুমায়ুনের ‘মহাজোট’ কেবল রাজনৈতিক আহ্বান হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তবে কোনও সমঝোতার রূপ নেবে, তার উত্তর মিলবে নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও এগোলে।


