বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে নেওয়া ১৯টি বই সময়মতো ফেরত না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরগরম বঙ্গ রাজনীতি। রাজ্যের গ্রন্থাগার বিষয়ক মন্ত্রী গৌরীশংকর ঘোষ দাবি করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯টি বই—যার মধ্যে রয়েছে **রবীন্দ্র রচনাবলীর ১৮টি খণ্ড এবং ‘সঞ্চয়িতা’**—প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জিম্মায় রয়েছে। অভিযোগ ঘিরে এবার সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মমতা।
ক্যাথিড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেন, **“প্রমাণ ছাড়া কোনও অভিযোগ করবেন না।”** একই সঙ্গে তাঁর দাবি, তিনি নিজেই বই লেখেন এবং চাইলে একটি গোটা লাইব্রেরি তৈরি করে দিতে পারেন।
## ঠিক কী অভিযোগ উঠেছে?
রাজ্যের গ্রন্থাগার বিষয়ক মন্ত্রী গৌরীশংকর ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে নেওয়া ১৯টি বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া হয়নি। বইগুলির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলীর ১৮টি খণ্ড এবং ‘সঞ্চয়িতা’ রয়েছে।
বিধানসভার গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ নাকি বিষয়টি নিয়ে মমতার সঙ্গে যোগাযোগও করেছিল। তবে মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, বইগুলি তাঁর বাড়িতে নেই। সেগুলি বিধানসভা ভবনের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট চেম্বারে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
## ‘বই চুরি’ অভিযোগেই ক্ষুব্ধ মমতা
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রমাণ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করা উচিত নয়।
তাঁর বক্তব্য, বইগুলি চুরি করা হয়েছে বা তিনি আত্মসাৎ করেছেন—এমন কোনও অভিযোগের ভিত্তি নেই। বরং তিনি নিজেই লেখালেখি করেন এবং তাঁর কাছে প্রচুর বই রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
মমতার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, **কোনও অভিযোগ করার আগে তার যথাযথ প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।**
## বিধানসভায় থাকলেও কেন ‘ফেরত’ নয়?
এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বইগুলির অবস্থান।
মমতার দাবি অনুযায়ী, বইগুলি তাঁর ব্যক্তিগত বাড়িতে নেই। সেগুলি বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট চেম্বারে রয়েছে। কিন্তু লাইব্রেরির নিয়ম অনুযায়ী, কোনও বই লাইব্রেরি থেকে ইস্যু হওয়ার পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইব্রেরিতে ফেরত না দেওয়া হলে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিটার্নড’ বা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হয় না।
অর্থাৎ বইগুলি বিধানসভা ভবনের মধ্যেই থাকলেও লাইব্রেরির রেকর্ডে সেগুলি এখনও ফেরত না দেওয়া বই হিসেবে থাকতে পারে।
## সাধারণ পাঠকের মতোই ব্যবস্থা?
বিধানসভা লাইব্রেরির বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত না দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকদের জন্য যে নিয়ম রয়েছে, মমতার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে বলে জানিয়েছেন গ্রন্থাগার মন্ত্রী।
গৌরীশংকর ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হলেও লাইব্রেরির নিয়ম তাঁর জন্য আলাদা হওয়া উচিত নয়।
এই বক্তব্যের পরেই বিষয়টি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়।
## ‘চাইলে গোটা লাইব্রেরি বানিয়ে দিতে পারি’
অভিযোগের জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে আসে তাঁর নিজের বই লেখার প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, তিনি নিজেই বই লেখেন এবং চাইলে একটি গোটা লাইব্রেরি তৈরি করে দিতে পারেন।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে বই নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনও প্রয়োজনীয় ভিত্তি নেই।
## রবীন্দ্রনাথের বই ঘিরে বিতর্ক
এই ঘটনায় যে বইগুলির কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলী এবং ‘সঞ্চয়িতা’ রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু লাইব্রেরির বই ফেরত দেওয়ার প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আবেগও যুক্ত হয়েছে।
বিধানসভা লাইব্রেরির বই কীভাবে ইস্যু করা হয়েছিল, বর্তমানে সেগুলির সঠিক অবস্থান কোথায় এবং লাইব্রেরির রেকর্ডে কী রয়েছে—এই বিষয়গুলিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা
বিধানসভা লাইব্রেরির বই নিয়ে এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতিমধ্যেই তীব্র। ফলে একটি প্রশাসনিক বা লাইব্রেরি-সংক্রান্ত বিষয়ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
একদিকে গ্রন্থাগার মন্ত্রীর অভিযোগ, অন্যদিকে মমতার পালটা দাবি—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এখনও মূল প্রশ্ন হল, **লাইব্রেরির নথিতে বইগুলি কী অবস্থায় রয়েছে এবং সেগুলি বাস্তবে কোথায় রাখা আছে।**
## আসল সত্য জানতে কী প্রয়োজন?
এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বিধানসভা লাইব্রেরির সংশ্লিষ্ট রেকর্ড খতিয়ে দেখা। কোন তারিখে বইগুলি ইস্যু করা হয়েছিল, কার নামে ইস্যু করা হয়েছিল, ফেরতের নির্ধারিত তারিখ কী ছিল এবং বর্তমানে লাইব্রেরির নথিতে সেগুলির স্ট্যাটাস কী—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
পাশাপাশি মমতার দাবি অনুযায়ী বইগুলি যদি সত্যিই বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রীর চেম্বারে থাকে, তাহলে সেগুলি লাইব্রেরিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
## বিতর্কের কেন্দ্রে ‘চুরি’ শব্দটি
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে ‘চুরি’ শব্দটিকে ঘিরে। সংবাদ প্রতিবেদনে অভিযোগটিকে বই ফেরত না দেওয়ার প্রসঙ্গে ‘চুরি’ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি এই ধরনের অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন।
তাই বই নির্ধারিত সময়ে ফেরত না দেওয়া এবং বই চুরি করার অভিযোগ—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কোনও বই ফেরত দিতে দেরি হওয়া এবং সেটি আত্মসাৎ বা চুরি করা হয়েছে—দুটির মধ্যে আইনি ও তথ্যগত পার্থক্য রয়েছে।
## শেষ কথা
বিধানসভা লাইব্রেরির ১৯টি বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গ্রন্থাগার মন্ত্রী গৌরীশংকর ঘোষের দাবি, রবীন্দ্র রচনাবলীর ১৮টি খণ্ড এবং ‘সঞ্চয়িতা’ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জিম্মায় রয়েছে। অন্যদিকে মমতা জানিয়েছেন, বইগুলি তাঁর বাড়িতে নেই, বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট চেম্বারে রয়েছে।
অভিযোগের জবাবে মমতার স্পষ্ট বার্তা—**প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করা যাবে না।** তিনি আরও বলেন, নিজে বই লেখেন এবং চাইলে গোটা একটি লাইব্রেরি তৈরি করে দিতে পারেন।
এখন নজর থাকবে বিধানসভা লাইব্রেরির রেকর্ড এবং বইগুলির প্রকৃত অবস্থান নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


