দুর্গাপুজোর আগে আমিষ খাবার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হল বাংলায়। কলকাতা সফরে এসে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ এবং তার আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি না করার আবেদন জানালেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। নবরাত্রির সময় বাংলার হিন্দুদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই ধর্মীয় রীতি, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি এবং পুজোর পরিসর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর এই বক্তব্য কোনও সরকারি নির্দেশ বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নয়। পুজো মণ্ডপে কী ধরনের খাবার বিক্রি বা পরিবেশন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির ভূমিকা রয়েছে। একই সময়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদও স্পষ্ট করেছে যে বাংলায় আমিষ খাবারের উপর কোনও সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার কথা তারা বলেনি।
### কী বললেন ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী?
তিন দিনের কলকাতা সফরে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী দুর্গাপুজোর সময় মণ্ডপের পরিবেশ নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, দেবীর প্রতিমার আশপাশে যেন আমিষ খাবারের বিক্রি বা আয়োজন না থাকে। পাশাপাশি তিনি বাংলার মানুষকে নবরাত্রির ধর্মীয় তাৎপর্য মনে রাখার আহ্বান জানান।
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুজোর সময় দেবীর আরাধনা এবং ধর্মীয় পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মণ্ডপের মতো উপাসনার জায়গার পাশে আমিষ খাবার বিক্রির বিষয়টি তিনি পছন্দ করেন না বলেই তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
এই মন্তব্যের পরেই প্রশ্ন উঠেছে—দুর্গাপুজোর মতো বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচারের সংজ্ঞা কে ঠিক করবেন? পুজো কমিটি, স্থানীয় মানুষ, নাকি কোনও ধর্মীয় সংগঠন? সেই বিতর্কই এখন আরও জোরালো হচ্ছে।
### বাংলার পুজোয় আমিষ খাবারের দীর্ঘ সংস্কৃতি
দুর্গাপুজো বাংলায় শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্য। পুজোর দিনগুলিতে বিভিন্ন বাড়ি ও বনেদি পরিবারে নিরামিষ ভোগের পাশাপাশি বহু জায়গায় আমিষ রান্নারও প্রচলন রয়েছে। ফলে দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমিষ খাবারের সম্পর্ক বাংলার খাদ্যসংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ।
এই জায়গাতেই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে আপত্তি উঠছে। সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, বাংলার দুর্গাপুজোর নিজস্ব আচার এবং খাদ্যসংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
অন্যদিকে তাঁর বক্তব্যের সমর্থকদের মতে, পুজোর মণ্ডপ নিজেই একটি ধর্মীয় পরিসর। তাই মণ্ডপের ভিতরে বা একেবারে আশপাশে খাবারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থাকা উচিত। ফলে বিষয়টি শুধু আমিষ বনাম নিরামিষের বিতর্ক নয়, বরং ধর্মীয় স্থান ও উৎসবের পরিবেশ কীভাবে পরিচালিত হবে—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
### VHP-র বক্তব্যেও তৈরি হয়েছিল বিতর্ক
আমিষ খাবার নিয়ে এই বিতর্ক অবশ্য ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যেই প্রথম শুরু হয়নি। এর আগে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুর্গাপুজো সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ নিয়েও বাংলায় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পুজোর মণ্ডপে আমিষ খাবার না রাখার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
পরে VHP-র তরফে স্পষ্ট করা হয়, তারা বাংলায় সব ধরনের আমিষ খাবারের উপর blanket ban বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার কথা বলেনি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল জোর ছিল পুজোর মণ্ডপের পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখার উপর।
অর্থাৎ ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত আবেদন এবং VHP-র বক্তব্যকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। দুটির প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও, আমিষ খাবারকে ঘিরে বিতর্ক একই সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
### পুজো কমিটিগুলির উপর কোনও বাধ্যতামূলক নির্দেশ নেই
বর্তমানে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যের ভিত্তিতে রাজ্যজুড়ে কোনও সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি। ফলে কোনও পুজো কমিটিকে সরকারি ভাবে আমিষ খাবার বিক্রি বা খাওয়ানো বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
প্রতিটি পুজো কমিটি তাদের নিজস্ব নিয়ম, স্থানীয় মানুষের মতামত এবং মণ্ডপের পরিবেশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোথাও পুজোর ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ, কোথাও আবার পুজোর সঙ্গে যুক্ত পারিবারিক বা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে আমিষের উপস্থিতি রয়েছে।
তাই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্যকে আপাতত ধর্মীয় আবেদন হিসেবেই দেখা হচ্ছে, প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবে নয়।
### নবরাত্রি পালনের আহ্বান
আমিষ খাবার নিয়ে মন্তব্যের পাশাপাশি বাংলায় নবরাত্রির ধর্মীয় রীতিনীতি আরও গুরুত্ব দিয়ে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে দুর্গাপুজোর সময় ভক্তি, উপাসনা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, একজন ধর্মীয় বক্তা হিসেবে তিনি নিজের বিশ্বাস ও ধর্মীয় মতামত প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, বাংলার নিজস্ব দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যকে কতটা বদলানোর পরামর্শ দেওয়া যায়?
### পুজোর আগে বিতর্কে নতুন মাত্রা
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যে একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি অনুদান, পুজো কমিটিগুলির ভূমিকা, মণ্ডপের থিম, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি এবার খাদ্যাভ্যাসও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
এরই মধ্যে পুজোর আগে খাবারের মান নিয়েও প্রশাসনের অভিযান চলছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানে নিম্নমানের বা পচা খাদ্যসামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে খাদ্য নিয়ে আলোচনা একদিকে ধর্মীয় বিতর্ক, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য—দুই দিকেই বিস্তৃত হয়েছে।
### ধর্মীয় রীতি বনাম বাংলার সংস্কৃতি—কোথায় সমাধান?
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। বাংলার দুর্গাপুজো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় আচার, পারিবারিক প্রথা, শিল্প, সাহিত্য, খাবার এবং সামাজিক মিলন—সবকিছুকে একসঙ্গে ধারণ করেছে।
তাই পুজোর সময় আমিষ খাবার নিয়ে কোনও একক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকবেই। এক পক্ষ ধর্মীয় পবিত্রতার যুক্তি দিচ্ছে, অন্য পক্ষ বাংলার দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলছে।
সব মিলিয়ে, বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য দুর্গাপুজোর আগে বাংলায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাঁর আবেদন বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পুজো কমিটি এবং সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্তের উপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—২০২৬-এর দুর্গাপুজোর আগে **আমিষ খাবার নিয়ে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিতর্ক আরও তীব্র হতে চলেছে।**


