দুর্গাপুজো মানেই বাংলায় উৎসব, ভিড়, প্যান্ডেল আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সেই উৎসবের আবহকেই এবার আরও বড় পরিসরে জনসংযোগের কাজে ব্যবহার করতে চাইছে সিপিএম। ২০২৬ সালের শারদোৎসবে রাজ্যজুড়ে দলের বুকস্টলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু বই বিক্রি নয়, মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও গভীর করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে।
বামপন্থী দলগুলির কাছে পুজোর সময় বইয়ের স্টল নতুন কোনও কর্মসূচি নয়। বহু বছর ধরেই বড় পুজো থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট বারোয়ারি উৎসবের আশপাশে মার্কসীয় সাহিত্য ও প্রগতিশীল বইয়ের স্টল করে এসেছে বামেরা। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন সময়ে এই কর্মসূচিতে ভাটা পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে ফের স্টলের সংখ্যা বাড়ানো হয়। এবার সেই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
### শুধু বই বিক্রি নয়, রাজনৈতিক বার্তাও
সিপিএমের পরিকল্পনায় এবার শুধুমাত্র বই বিক্রিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বুকস্টলকে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথাবলার একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছে দল। মার্কসবাদ, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা এবং সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রকাশিত বই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় নেতৃত্বের মতে, পুজোর সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় বের হন। বিভিন্ন পুজোমণ্ডপের সামনে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বইয়ের স্টল থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দলের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং সাংস্কৃতিক অবস্থান মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাইছে সিপিএম।
### ছাত্র-যুবদের আরও বেশি যুক্ত করার পরিকল্পনা
এবারের উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ছাত্র ও যুবদের অংশগ্রহণে। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বামপন্থী চিন্তাধারার যোগাযোগ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দল। তাই স্টলে বসে শুধু বই বিক্রি নয়, বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা, পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বামপন্থী দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ার পর সিপিএমের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা। সেই জায়গা থেকেই বই এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে আবার সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
### রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও ‘সাংস্কৃতিক পরিসর’ ধরে রাখার বার্তা
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাম নেতৃত্বের একাংশ মনে করছে, ভোটের রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরেও সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই পুজোর বুকস্টলকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং মানুষের মধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের চর্চা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছে দল।
সিপিএমের এক রাজ্য কমিটির সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র ছেড়ে দিলে চলবে না। যেখানে সম্ভব, সেখানে বুকস্টলের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় পুজো কমিটি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই এই কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
### অতীতেও পুজোর বুকস্টলে সাড়া পেয়েছে বামেরা
পুজোর বুকস্টল সিপিএমের কাছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মসূচি। অতীতের বিভিন্ন বছরেও এই স্টলগুলিতে উল্লেখযোগ্য বই বিক্রির দাবি করেছে দল। ২০২১ সালে সিপিএম জানিয়েছিল, রাজ্যজুড়ে প্রায় ১,২০০টি বুকস্টল করা হয়েছিল এবং পুজোর সময় বই বিক্রির পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। সে সময় মার্কসীয় সাহিত্য, সমকালীন রাজনীতি এবং বামপন্থী চিন্তাধারার বইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়েও পাঠকদের আগ্রহ দেখা গিয়েছিল বলে দলীয় নেতৃত্ব জানিয়েছিল।
২০২২ সালেও হাওড়া ও হুগলির মতো জেলায় বুকস্টলে বই বিক্রি বৃদ্ধির কথা সামনে এসেছিল। হুগলিতে ২০১৯ সালের তুলনায় স্টলের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় বই বিক্রিতেও বৃদ্ধি হয়েছিল বলে স্থানীয় দলীয় নেতৃত্ব দাবি করেছিল।
অর্থাৎ, পুজোর বুকস্টলকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের অভিজ্ঞতা সিপিএমের রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই এবার আরও বিস্তৃত কর্মসূচির দিকে এগোতে চাইছে দল।
### গেরুয়া প্রভাবের মাঝেও সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা
২০২৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্যে বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধির কথাও সিপিএমের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রয়েছে। পুজোর সময় সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখার নির্দেশও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের বক্তব্য, কোনও ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা হুমকির কাছে পিছিয়ে না গিয়ে যেখানে সুযোগ রয়েছে সেখানে বুকস্টল করতে হবে। তবে স্থানীয় পুজো কমিটি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই কর্মসূচি চালানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
### পুজোর ভিড়কে জনসংযোগের মঞ্চ হিসেবে দেখতে চাইছে দল
দুর্গাপুজোর সময়ে কলকাতা ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়। সেই ভিড়ের মধ্যে বইয়ের স্টল স্বাভাবিকভাবেই একটি আলাদা সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করতে পারে। সিপিএম এবার সেই পরিসরকেই আরও বড় করতে চাইছে।
বই বিক্রির পাশাপাশি পাঠকের সঙ্গে আলোচনা, তরুণদের যুক্ত করা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে জনসংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় সিপিএমের বুকস্টল শুধুমাত্র বই কেনাবেচার জায়গা থাকবে না, বরং দলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।


