জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা কি জাতীয় স্তরে পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না? আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে কি অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার পিছিয়ে পড়ছেন? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলেন প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনার শিখর ধাওয়ান। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ভারতীয় ক্রিকেটে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল বা রাজ্যের ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হয় না। পারফরম্যান্সই শেষ কথা। তবে ক্রিকেটে কখনও কখনও ভাগ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
শ্রীনগরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ধাওয়ান বলেন, কোনও ক্রিকেটার যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করেন, তাহলে তাঁকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, শুধু জম্মু-কাশ্মীর নয়, দিল্লি, মুম্বই বা দেশের অন্য যে কোনও জায়গার ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেই এমন হতে পারে যে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনও নির্দিষ্ট সময়ে সুযোগ পাওয়া যায়নি।
### ‘পারফরম্যান্সই কথা বলবে’, বললেন ধাওয়ান
ধাওয়ানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে কখনও কখনও ভাগ্যও ভূমিকা নেয়। কোনও ক্রিকেটার হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে থেকেও সুযোগ পেলেন না, আবার অন্য কেউ সেই জায়গা পেয়ে গেলেন—ক্রিকেটে এমন ঘটনা নতুন নয়।
অর্থাৎ, জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা কম সুযোগ পাচ্ছেন বলে যে আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগ উঠছে, তা সরাসরি মানতে নারাজ ধাওয়ান। বরং তাঁর মতে, ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে যেতে হবে এবং সুযোগ এলে সেটিকে কাজে লাগাতে হবে।
### জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটে বাড়ছে নজর
ধাওয়ানের মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটে একের পর এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। ২০২৫-২৬ মরশুমে প্রথমবার রঞ্জি ট্রফি জিতেছে জম্মু-কাশ্মীর। ফাইনালে কর্ণাটকের বিরুদ্ধে ম্যাচ ড্র হলেও প্রথম ইনিংসে বড় লিড নেওয়ার সুবাদে ঐতিহাসিক খেতাব জিতে নেয় J&K। ৬৭ বছরের রঞ্জি ইতিহাসে এটি ছিল তাদের প্রথম শিরোপা।
এই সাফল্যের ফলে উপত্যকার ক্রিকেটারদের নিয়ে জাতীয় স্তরে আগ্রহও বেড়েছে। ধাওয়ান নিজেও জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটারদের শারীরিক সক্ষমতা ও বিশেষ করে পেস বোলারদের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, এই অঞ্চলের তরুণ ক্রিকেটারদের গড়ন যথেষ্ট শক্তিশালী এবং পেস বোলিংয়ের জন্য তাঁদের স্বাভাবিক ক্ষমতাও রয়েছে।
### ‘এখানকার পেসাররা যথেষ্ট প্রতিভাবান’
শ্রীনগরের অনুষ্ঠানে ধাওয়ান জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটারদের শারীরিক সক্ষমতার প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের পেসারদের মধ্যে যথেষ্ট শক্তি ও প্রতিভা রয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, গত কয়েক বছরে এখানে ক্রিকেট খেলার সুযোগ এবং ম্যাচের সংখ্যা বাড়ছে।
ধাওয়ানের মতে, কোনও ক্রিকেটার যত বেশি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলবেন, ততই তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়বে। সেই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
### নতুন ক্রিকেট লিগে তৈরি হবে সুযোগ
শিখর ধাওয়ান ও প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার তথা ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়া শ্রীনগরে নতুন **Pro Star Cricket League (PSCL)**-এর দ্বিতীয় মরশুমের সূচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এই প্রতিযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য হল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটারদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ করে দেওয়া।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার কথা। শ্রীনগর থেকে শুরু হয়ে টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা দেরাদুনে। ধাওয়ান এবং জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন অধিনায়ক পারভেজ রসুলকে এই লিগের আইকনিক প্লেয়ার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
### জাতীয় দলের দরজা খুলতে পারে নতুন প্রতিভাদের জন্য
নতুন এই লিগের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের তরুণ ক্রিকেটাররা প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলার এবং তাঁদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাবেন। এর ফলে স্থানীয় প্রতিভারা আরও বড় মঞ্চে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরতে পারবেন বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
আকাশ চোপড়াও জানিয়েছেন, জম্মু-কাশ্মীরে প্রতিভার অভাব নেই। প্রয়োজন প্রতিভাকে চিহ্নিত করে সঠিকভাবে গড়ে তোলা এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের সুযোগ দেওয়া। তাঁর মতে, এখান থেকে ভবিষ্যতে ভারতের পরবর্তী বড় পেসার উঠে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
### Auqib Nabi-র উত্থানেও বদলেছে ছবিটা
জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটে পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ Auqib Nabi। গত মরশুমে রঞ্জি ট্রফিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর তিনি ভারতীয় টেস্ট দলে জায়গা করে নেন। ২০২৫-২৬ মরশুমে J&K-এর ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ে তাঁর বোলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এবং তিনি ৬০টি উইকেট সংগ্রহ করেন। এর ফলে তিনি জম্মু-কাশ্মীর থেকে ভারতের টেস্ট দলে নির্বাচিত হওয়া প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নজির গড়েন।
এছাড়াও Umran Malik এবং Abdul Samad-এর মতো ক্রিকেটাররা জম্মু-কাশ্মীর থেকে উঠে এসে IPL-এর মঞ্চে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ফলে উপত্যকার ক্রিকেট যে ধীরে ধীরে দেশের মূল ক্রিকেট ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হচ্ছে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
### ধাওয়ানের বক্তব্যের তাৎপর্য কোথায়?
শিখর ধাওয়ানের বক্তব্যের মূল কথা হল—সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করতে হবে। তবে একই সঙ্গে নিয়মিত ম্যাচ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ যে তরুণ ক্রিকেটারদের উন্নতির জন্য অত্যন্ত জরুরি, নতুন ক্রিকেট লিগের উদ্যোগে সেটিও স্পষ্ট।
জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। এবার স্থানীয় ক্রিকেটাররা আরও বেশি সুযোগ পেলে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁদের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। শিখর ধাওয়ানের মন্তব্য সেই সম্ভাবনাকেই নতুন করে সামনে আনল।


