রাজ্যে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে এবার কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হলেন এক আবেদনকারী। অভিযোগের কেন্দ্রে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের এক তৃণমূল পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রকৃত যোগ্য ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে নিজের পরিবারের সদস্যদের সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। মামলার শুনানিতে অভিযোগগুলি আপাতত একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে জানিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। ইতিমধ্যেই পুলিশ তদন্ত শুরু করায় সেই তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মামলাটি শুনেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যেহেতু অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই পুলিশ মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে, তাই আপাতত তদন্তের অগ্রগতি দেখতেই চায় আদালত।
### কী অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে?
মামলার আবেদনকারী সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা সুরজ শেখ। তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য আশিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বজনপোষণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, যে সরকারি অর্থ প্রকৃতপক্ষে যোগ্য প্রতিবন্ধী এবং বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের পাওয়ার কথা, সেই অর্থ এমন কয়েকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যাঁরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ওই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে কারণ, আশিকুল ইসলাম নিজের পরিবারের সদস্যদের নামও সুবিধাভোগীদের তালিকায় ঢোকানোর ক্ষেত্রে পদমর্যাদা ব্যবহার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। মামলার তদন্তের পরই প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে।
### প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার নিয়ম কী?
রাজ্যে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের সরকারি ভাতা চালু রয়েছে। নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর অন্তত ৪০ শতাংশ বা তার বেশি শারীরিক অক্ষমতার চিকিৎসা-সংক্রান্ত শংসাপত্র থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত ১০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হয়। পরিবারের বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকার বেশি হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অন্য কোনও সরকারি সুবিধার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারি অর্থ যাতে প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষের কাছেই পৌঁছয়, তার জন্য একাধিক যোগ্যতার শর্ত নির্ধারিত রয়েছে।
### ১৫টি শংসাপত্রের মধ্যে ১৩টিই ভুয়ো?
মামলার শুনানিতে তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের সামনে তুলে ধরে পুলিশ। সামশেরগঞ্জ থানার আইসির রিপোর্ট অনুযায়ী, তদন্তের সময় মোট ১৫টি প্রতিবন্ধী শংসাপত্র খতিয়ে দেখা হয়েছে। তার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১৩টি শংসাপত্র ভুয়ো বলে মনে হয়েছে বলে পুলিশের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্যই মামলাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ অভিযোগ সত্যি হলে প্রশ্ন উঠবে, কীভাবে ওই নথি তৈরি হয়েছিল এবং সরকারি ভাতা প্রকল্পের যাচাই প্রক্রিয়ায় সেগুলি কীভাবে অনুমোদিত হল।
তবে ‘ভুয়ো’ বলে প্রাথমিক তদন্তে চিহ্নিত হওয়া এবং আদালতে চূড়ান্তভাবে জাল প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট নথির প্রকৃত অবস্থা এবং দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে।
### ইতিমধ্যেই মামলা রুজু করেছে পুলিশ
রাজ্যের তরফে আদালতে জানানো হয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে সামশেরগঞ্জ থানায় গত ৫ জুলাই মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকজন অভিযুক্তকে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৩৫(৩) ধারায় নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং মামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
আবেদনকারীর তরফে অবশ্য এই তদন্তে সন্তুষ্ট না হয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইকে দিয়ে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। তাঁর আইনজীবী ওমর ফারুক গাজীর দাবি, প্রকৃত যোগ্যদের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ অযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে বিলি করা হয়ে থাকতে পারে এবং পদমর্যাদার অপব্যবহার করে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
### দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ
শুনানির সময় আদালত জানিয়েছে, আবেদনকারীর তোলা অভিযোগগুলি এই পর্যায়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে যেহেতু পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে, তাই আদালত সরাসরি সেই তদন্তের ফল দেখতে চেয়েছে।
পুলিশকে দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। অর্থাৎ, অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা, ভুয়ো শংসাপত্রের উৎস, কারা সরকারি ভাতা পেয়েছেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা ছিল কি না—সবই তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।
### প্রকৃত উপভোক্তারা বঞ্চিত হয়েছেন কি?
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল, যদি অযোগ্য ব্যক্তিদের নামে সরকারি ভাতা বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে কেউ কি সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন?
সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরির সময় যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রতিবন্ধিতার শংসাপত্র, আয়, বসবাসের মেয়াদ এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়ার তথ্য যাচাই না করে ভাতা দেওয়া হলে সরকারি অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই এই মামলায় শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নয়, ভাতা অনুমোদনের পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
### এখন নজর পুলিশের তদন্তে
আপাতত কলকাতা হাই কোর্ট সিবিআই তদন্তের আবেদন গ্রহণ করে সরাসরি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে মামলা তুলে দেয়নি। বরং রাজ্য পুলিশের চলমান তদন্তের অগ্রগতি দেখার পথেই এগিয়েছে আদালত। দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশের ফলে আগামী দিনে এই মামলায় আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
প্রাথমিক তদন্তে ১৫টি শংসাপত্রের মধ্যে ১৩টি নিয়ে সন্দেহের তথ্য সামনে আসায় মামলাটির গুরুত্ব বেড়েছে। তবে কারা প্রকৃতপক্ষে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত, সরকারি অর্থের কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং তৃণমূল পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য আশিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য—সেসব এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
ফলে আদালতের এই নির্দেশকে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


