দু’মুঠো ভাতের সঙ্গে ডাল কিংবা সামান্য তরকারি—বাঙালি মধ্যবিত্তের বহু পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের অন্যতম ভরসা চাল। কিন্তু সেই চালের দামই এখন নতুন করে চিন্তা বাড়াচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের খুচরো বাজারে একাধিক ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে রান্নাঘরের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে মধ্যবিত্তের মধ্যে জনপ্রিয় বিভিন্ন চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকিট, বাঁশকাঠি কিংবা দুধের সরের মতো সরু চালের পাশাপাশি মোটা চালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মজুতের কারণে এই মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
## বন্যার প্রভাব পড়েছে চালের সরবরাহে
চালের দাম বৃদ্ধির পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, হুগলি এবং বর্ধমানের একাধিক এলাকায় বন্যার কারণে রাইস মিলগুলির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। ফলে গুদামে ধান বা চাল থাকলেও তার একটা অংশ নিয়মিতভাবে বাজারে পৌঁছতে পারছে না।
অর্থাৎ, রাজ্যে চালের উৎপাদন একেবারে কমে গিয়েছে এমন নয়। কিন্তু উৎপাদিত চালের একটি অংশ সময়মতো বাজারে না আসায় খুচরো বাজারে সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। আর সেই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে দামে।
বিশেষ করে সরু চালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও চোখে পড়ার মতো। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার কিছু চাল ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মজুতদারদের একাংশ গত কয়েক মাসে ধীরে ধীরে বাজারে চাল ছাড়ছেন। তাঁদের দাবি, গত তিন মাসে মিনিকিট বা বাঁশকাঠির মতো চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাসমতি চালের ক্ষেত্রেও পাইকারি বাজারে কুইন্টালপিছু উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
## উৎপাদন বেশি হলেও কেন দাম বাড়ছে?
চলতি বছরে রাজ্যে ধানের উৎপাদন তুলনামূলক ভালো হলেও চালের বাজারে তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাইস মিল মালিকদের বক্তব্য, ধানের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ৬০ কেজির ধানের বস্তা গত বছরের তুলনায় এবার ২০০ টাকারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
শুধু ধানের দাম নয়, চাল তৈরির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খরচও বেড়েছে। রাইস মিলের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং জিএসটি সংক্রান্ত খরচের চাপও উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে বলে মিল মালিকদের একাংশ জানিয়েছেন। ফলে মিল থেকে চাল বেরোনোর সময়ই তার দাম আগের তুলনায় বেশি থাকছে। সেই অতিরিক্ত খরচ পরবর্তী ধাপে পাইকারি ও খুচরো বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান বাজারের সরকারি-ভিত্তিক মাণ্ডি তথ্যেও বিভিন্ন এলাকায় চালের দামে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ৫ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের রিপোর্ট করা কয়েকটি বাজারে চালের মোডাল দাম প্রায় ৩,২০০ থেকে ৫,৩০০ টাকা প্রতি কুইন্টালের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ চালের ধরন, মান, বাজার এবং সরবরাহের উপর ভিত্তি করে দামে বড় ফারাক রয়েছে।
## মধ্যবিত্তের বাজেটে বাড়ছে চাপ
চালের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজার খরচে। যেসব পরিবার প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ কেজি বা তার বেশি চাল কেনে, তাদের ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি কয়েক টাকা বৃদ্ধিও মাস শেষে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত খরচ তৈরি করতে পারে।
শুধু বাড়ির রান্নাঘর নয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ছোট খাবারের ব্যবসার ক্ষেত্রেও চালের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কাঁচামালের খরচ বাড়লে খাবারের দাম বাড়ানো অথবা লাভের পরিমাণ কমিয়ে ব্যবসা চালানোর মধ্যে কোনও একটি পথ বেছে নিতে হতে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাল এমন একটি খাদ্যপণ্য যার ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া অনেক পরিবারের পক্ষে সহজ নয়। ফলে অন্যান্য বাজার খরচ কমিয়েই চালের বাড়তি দাম সামাল দিতে হচ্ছে।
## দ্রুত দাম কমার আশ্বাস
তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই আশ্বাস দিয়েছে রাজ্যের ক্রেতা সুরক্ষা দফতর। দফতরের দাবি, খুব শীঘ্রই খুচরো বাজারে চালের দাম কমতে পারে। সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং গুদামে আটকে থাকা চাল বাজারে এলে মূল্যবৃদ্ধির চাপও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাস্তবে দাম কবে থেকে কমবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর—বন্যার প্রভাব কত দ্রুত কাটছে, রাইস মিলগুলির উৎপাদন ও সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক হচ্ছে, মজুতদাররা কতটা চাল বাজারে ছাড়ছেন এবং ধানের কাঁচামালের দাম কোথায় গিয়ে স্থির হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাজ্যে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদনের দাবি থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে তৈরি হওয়া সমস্যাই এখন চালের খুচরো দামে প্রভাব ফেলছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে বাজারে সরবরাহ বাড়ে কি না, সেটাই আপাতত নজরে সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবার।


