বাবা বা মায়ের মৃত্যুর সময় কোনও মেয়ে যদি আইনত বিবাহিত থাকেন, পরবর্তীকালে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হলেও সেই পরিবর্তনের ভিত্তিতে নতুন করে ‘ফ্যামিলি পেনশন’-এর অধিকার তৈরি হবে না। এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে কলকাতা হাই কোর্ট। একটি মামলার শুনানিতে আদালত স্পষ্ট করেছে, পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কন্যার বৈবাহিক অবস্থার পাশাপাশি তিনি ওই সময় বাবা বা মায়ের উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন কি না, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু কোনও মহিলা অবিবাহিত, বিধবা অথবা বিবাহবিচ্ছিন্ন হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্যামিলি পেনশনের অধিকারী হয়ে যাবেন না। পেনশনভোগী বাবা বা মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর যোগ্যতা কী ছিল, সেটিই মূল বিষয়। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়মে যে শ্রেণির পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক পেনশনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময় আবেদনকারী সেই শ্রেণির মধ্যে পড়ছিলেন কি না এবং তাঁর আর্থিক নির্ভরশীলতার প্রমাণ রয়েছে কি না—এই দুই বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
### মামলাটি কী নিয়ে?
এই মামলার আবেদনকারী গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়। তাঁর বাবা কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা বা CSTC-তে কর্মরত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি পারিবারিক পেনশনের দাবি জানান। গায়ত্রীর দাবি ছিল, তাঁর স্বামী তাঁকে পরিত্যাগ করার পর ২০০১ সাল থেকে তিনি বাবার উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। সেই কারণে বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ফ্যামিলি পেনশন পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে আদালতের কাছে দাবি করেন তিনি।
আবেদনকারীর যুক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল ২০০৮ সালের ১২ নভেম্বরের সরকারি বিজ্ঞপ্তি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে অবিবাহিত, বিধবা এবং বিবাহবিচ্ছিন্ন কন্যাদের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ‘ফ্যামিলি’-র আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সংস্থাও ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ একটি সার্কুলারের মাধ্যমে সেই বিধান গ্রহণ করেছিল বলে আদালতে জানানো হয়। তাই নিজের পরিস্থিতির ভিত্তিতে পারিবারিক পেনশনের দাবি করেন গায়ত্রী।
### আদালতে আপত্তি জানায় কর্তৃপক্ষ
গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়ের দাবির বিরোধিতা করেন হাই কোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী নয়নচাঁদ বিহানি। তাঁর বক্তব্য ছিল, আবেদনকারী বর্তমানে বিবাহবিচ্ছিন্ন হলেও তাঁর বাবার মৃত্যুর সময় তিনি আইনত ডিভোর্সি ছিলেন না।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গায়ত্রীর বাবা ২০১৮ সালে মারা যান। তার আগে একটি বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করা হলেও সেটি খারিজ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে, ২০২১ সালে নতুন করে ডিভোর্সের মামলা করা হয়। ফলে বাবার মৃত্যুর সময় তাঁর বৈবাহিক অবস্থাকে ‘ডিভোর্সি’ বলা যায় কি না, সেটিই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
এই বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের রায়ে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি পেনশনের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পেনশনভোগী বাবা বা মায়ের মৃত্যুর তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কাট-অফ ডেট’ হিসেবে বিবেচিত হবে। পরবর্তীকালে কোনও ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে শুধুমাত্র সেই কারণে আগের তারিখ থেকে পেনশনের অধিকার তৈরি করা যাবে না।
### আর্থিক নির্ভরশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ
আদালত একইসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে—শুধু অবিবাহিত, বিধবা কিংবা ডিভোর্সি হওয়াই ফ্যামিলি পেনশনের জন্য যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক নির্ভরশীলতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, কোনও কন্যা যদি বাবার মৃত্যুর সময় এমন একটি শ্রেণিতে থাকেন, যাঁদের জন্য সরকারি নিয়মে ফ্যামিলি পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে, তাহলেও তাঁকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হতে পারে। পেনশন মূলত নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা হওয়ায়, বাস্তবে ওই নির্ভরশীলতা ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
### তাহলে কি সব ডিভোর্সি মেয়ে পেনশন পাবেন না?
এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে, কোনও বিবাহবিচ্ছিন্ন কন্যাই কখনও ফ্যামিলি পেনশন পেতে পারবেন না। বিভিন্ন সরকারি নিয়ম এবং মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপর যোগ্যতা নির্ভর করে।
এর আগেও কলকাতা হাই কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিবাহবিচ্ছিন্ন কন্যার পক্ষে রায় দিয়েছিল। সেই মামলায় আদালত জানিয়েছিল, পেনশনভোগী বাবা বা মায়ের জীবদ্দশায় বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট কন্যার আর্থিক নির্ভরশীলতা প্রমাণিত হলে, চূড়ান্ত ডিভোর্সের ডিক্রি পরে হলেও নির্দিষ্ট সরকারি নিয়মের আওতায় ফ্যামিলি পেনশন পাওয়া সম্ভব।
অর্থাৎ, দুই মামলার পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মৃত্যুর সময় বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া এবং নির্ভরশীলতার প্রমাণ ছিল কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; অন্য ক্ষেত্রে সেই সময়কার বৈবাহিক অবস্থাই ছিল মূল প্রশ্ন। তাই প্রতিটি মামলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তি, সময়কাল, বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক নির্ভরশীলতার তথ্য আলাদাভাবে বিচার করা হবে।
### সরকারি পেনশন ব্যবস্থায় রায়ের গুরুত্ব
ফ্যামিলি পেনশন মূলত সরকারি কর্মচারী বা পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি। সেই কারণে কোন পরিস্থিতিতে কোনও কন্যা ‘পরিবারের সদস্য’ হিসেবে বিবেচিত হবেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামী পরিত্যাগ, আর্থিক নির্ভরশীলতা এবং ডিভোর্সের মামলা কখন শুরু হয়েছিল—এই বিষয়গুলি অনেক সময় পেনশন সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কলকাতা হাই কোর্টের সাম্প্রতিক রায় সেই জটিলতারই একটি নির্দিষ্ট দিক সামনে এনেছে।
এই মামলায় আদালতের মূল বক্তব্য হল, পরে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা দিয়ে আগের একটি নির্দিষ্ট তারিখে বিদ্যমান যোগ্যতা নতুন করে তৈরি করা যায় না। তাই পেনশনভোগী বাবা বা মায়ের মৃত্যুর সময় সংশ্লিষ্ট কন্যার বৈবাহিক অবস্থান এবং নির্ভরশীলতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।
ফলে, ভবিষ্যতে ফ্যামিলি পেনশন সংক্রান্ত কোনও দাবি উঠলে শুধু ‘ডিভোর্স হয়েছে’—এই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কখন ডিভোর্স হয়েছে, কখন বিবাহবিচ্ছেদের মামলা শুরু হয়েছিল, বাবা বা মা কখন মারা গিয়েছেন এবং সেই সময় আবেদনকারী আর্থিকভাবে কার উপর নির্ভরশীল ছিলেন—প্রতিটি তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই নির্দিষ্ট মামলায় সেই বিষয়গুলিই বিবেচনা করে গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়ের ফ্যামিলি পেনশনের আবেদন খারিজ করেছে কলকাতা হাই কোর্ট।


