# ছাত্র আন্দোলনকেই হাতিয়ার, ‘একের বিরুদ্ধে এক’ ফর্মুলায় বিজেপিকে রুখতে নতুন পথে সিপিএম
দেশের পাশাপাশি বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছে সিপিএম। আর সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশল নতুন করে সাজাতে চাইছে বাম দলটি। শনিবার থেকে কল্যাণীতে শুরু হচ্ছে সিপিএমের সাংগঠনিক প্লেনাম বা বর্ধিত অধিবেশন। সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পথ খোঁজা হতে পারে। একইসঙ্গে বিজেপি-বিরোধী লড়াই এবং ইন্ডিয়া জোটকে আরও শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা।
সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির মতে, বিহারের বাঁকিপুরের উপনির্বাচন এবং দিল্লি-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্র আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলি জাতীয় রাজনীতিকে একটি ‘টার্নিং পয়েন্টে’ নিয়ে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
## কল্যাণীতে বসছে সিপিএমের প্লেনাম
বিধানসভা নির্বাচনের আগে ও পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে কল্যাণীতে দু’দিনের বর্ধিত রাজ্য কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজ্য কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং বিভিন্ন গণসংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বও বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।
২০২৫ সালের রাজ্য সম্মেলনে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং আগামী দিনে সংগঠনকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়—এই বিষয়গুলিও প্লেনামে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
## ছাত্র আন্দোলনকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ দেখছে বাম নেতৃত্ব
সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির বক্তব্যে ছাত্র আন্দোলনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, বিহারের বাঁকিপুরের উপনির্বাচন এবং দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের আন্দোলন ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সিপিএম সেই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের বাম ছাত্র সংগঠনগুলির যোগসূত্রকে আরও রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
## বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ের নতুন রূপরেখা
সিপিএমের প্লেনামে বিজেপি-বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মহম্মদ সেলিমের অভিযোগ, গোটা দেশে বিজেপি ‘দখলদারির রাজনীতি’ করছে। তাঁর দাবি, এরই অনুকরণে একটি ‘বাধ্য’ বিরোধী দল তৈরি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সংগঠনকে তৃণমূল স্তরে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করছে সিপিএম।
## ‘একের বিরুদ্ধে এক’ ফর্মুলায় জোর
বিজেপিকে পরাস্ত করার ক্ষেত্রে বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়, সেই কৌশলের উপর জোর দিয়েছেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী লোকসভা নির্বাচনে ৪০০-র বেশি আসনে বিজেপির বিরুদ্ধে একজন করে বিরোধী প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ যেখানে বিজেপি প্রার্থী থাকবে, সেখানে বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে একজন প্রার্থীকে সামনে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিপিএমের ধারণা, ‘একের বিরুদ্ধে এক’ লড়াই হলে বিজেপিকে হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। বাকি আসনগুলিতে প্রয়োজন হলে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই হতে পারে।
## ইন্ডিয়া জোট নিয়ে কী বলছে সিপিএম?
এম এ বেবি জানিয়েছেন, গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ইন্ডিয়া জোট গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। মাঝেমধ্যে মতপার্থক্য বা সমস্যা তৈরি হলেও বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে সিপিএম।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপি-বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলকে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। বিশেষ করে আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে ‘একের বিরুদ্ধে এক’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## ‘এক দেশ, এক ভোট’-এর বিরোধিতা করবে ইন্ডিয়া জোট
‘এক দেশ, এক ভোট’ প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলগুলির ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কথা জানিয়েছেন এম এ বেবি।
তিনি জানান, দেশে যদি ‘এক দেশ, এক ভোট’ ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে ইন্ডিয়া জোট একসঙ্গে তার বিরোধিতা করবে।
অর্থাৎ শুধু নির্বাচনী আসন সমঝোতাই নয়, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার মতো বড় নীতিগত প্রশ্নেও বিরোধীদের একটি যৌথ অবস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে।
## মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফর্মুলার সঙ্গে মিল?
রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী দেওয়ার যে কৌশলের কথা সিপিএম এখন বলছে, একই ধরনের ফর্মুলার কথা আগে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেছিলেন।
সিপিএমের এই অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—বিজেপি-বিরোধী ভোট একত্রিত করার ক্ষেত্রে কি তৃণমূলের প্রস্তাবিত কৌশলের সঙ্গেই মিলছে বামেদের বর্তমান অবস্থান?
তবে তৃণমূলের সঙ্গে রাজ্যে সিপিএমের রাজনৈতিক বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে। তাই জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী সমঝোতার প্রশ্নটি রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে কীভাবে মেলানো হবে, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
## সংগঠন শক্তিশালী করাই সেলিমের অন্যতম লক্ষ্য
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের রাজ্য সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এখন সেই সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তার পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি আগামী দিনে দলের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা হবে।
অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটানোও এবারের প্লেনামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
## বদলে গিয়েছে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দাবি সেলিমের
মহম্মদ সেলিমের দাবি, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরিত্র বদলে গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের মতো বিজেপিও রাজ্য রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরকে নতুন করে সংগঠিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে সিপিএম। দলের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি কেন্দ্রগুলির উপরও আক্রমণ আসছে।
## যাদবপুর প্রসঙ্গে আক্রমণাত্মক সেলিম
প্লেনামের আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়েও মুখ খোলেন মহম্মদ সেলিম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করে তিনি নন্দীগ্রাম ও কিষাণজি প্রসঙ্গ তোলেন।
সেলিমের দাবি, নন্দীগ্রামে শিল্পবিরোধী আন্দোলনের সময় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কিষাণজির সাহায্য নিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কথোপকথনের অডিও দলের হাতে রয়েছে। প্রয়োজন হলে সেই অডিও প্রকাশ করা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাপানউতোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
## মোদি-বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের গুরুত্ব
সিপিএমের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলে ছাত্র আন্দোলন যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে চলেছে, প্লেনামের আগে দলের নেতাদের বক্তব্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি, নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা এবং ছাত্র-যুবদের বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চাইছে বাম দলটি।
তৃণমূল ও বিজেপির বাইরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বামেদের নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করাই এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
## কেন ছাত্র আন্দোলনের দিকে নজর বামেদের?
একসময় ছাত্র ও যুব সংগঠন ছিল বাম রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই সাংগঠনিক প্রভাব অনেকটাই কমেছে।
ফলে শিক্ষা ও নিয়োগ সংক্রান্ত ইস্যুতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে জনসংযোগ তৈরির সুযোগ দেখছে সিপিএম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির যোগাযোগ বাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
## সামনে কী কৌশল নেবে সিপিএম?
কল্যাণীর প্লেনামে মূলত কয়েকটি বিষয়ে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারিত হতে পারে—
* তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই
* ছাত্র আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করা
* সংগঠনকে তৃণমূল স্তরে মজবুত করা
* বিজেপি-বিরোধী দলগুলির সঙ্গে সমন্বয়
* ইন্ডিয়া জোটকে সক্রিয় রাখা
* আসন সমঝোতায় ‘একের বিরুদ্ধে এক’ কৌশল
* ২০২৫ সালের রাজ্য সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর্যালোচনা
এই বিষয়গুলির উপরেই আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির বড় অংশ নির্ভর করতে পারে।
## শেষ কথা
কল্যাণীতে সিপিএমের সাংগঠনিক প্লেনাম এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও বিরোধী দলগুলির সামনে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো, সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিজেপি-বিরোধী ভোটকে এক জায়গায় আনার কৌশল এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী দেওয়ার ফর্মুলা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের মধ্যে কতটা সমঝোতা তৈরি হবে এবং ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সিপিএম কতটা জনভিত্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনীতিতে।
তবে আপাতত কল্যাণীর প্লেনাম থেকে সিপিএম যে বার্তা দিতে চাইছে তা স্পষ্ট—পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুরনো কৌশল নয়, ছাত্র আন্দোলন ও বৃহত্তর বিজেপি-বিরোধী ঐক্যকে সামনে রেখে নতুন পথ খুঁজতে চাইছে দলটি।


