কলকাতার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে ফের বন্দির সেল থেকে মোবাইল উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আফতাব আহমেদ আনসারির সেলে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু মোবাইল নয়, তাঁর সেল থেকে মিলেছে দুটি রাউটার, ওয়াইফাই সংক্রান্ত যন্ত্র, দুটি কার্ড রিডার, একটি পেন ড্রাইভ এবং ইয়ারফোনও। পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে নগদ ৩১ হাজার টাকা।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষের তরফে হেস্টিংস থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়েছে। এখন তদন্তকারীদের মূল প্রশ্ন—জেলের ভিতরে এতগুলি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম কীভাবে পৌঁছল এবং সেগুলি ব্যবহার করে আফতাব কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন?
## গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আফতাব জেলের ভিতর থেকে মোবাইলে কথা বলছেন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন—এমন তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছেছিল।
সেই খবরের ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ১৪ নম্বর সেলে তল্লাশি চালান কারা আধিকারিকরা। তল্লাশির সময় তাঁর জামাকাপড় এবং বিছানাপত্রের মধ্যে থেকে একাধিক মোবাইল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায় জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
## তিনটি মোবাইল, সঙ্গে রাউটারও
আফতাবের সেল থেকে মোট তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে দুটি রাউটার এবং ওয়াইফাই সংক্রান্ত সরঞ্জাম।
জেলের ভিতরে বন্দির কাছে শুধু মোবাইল থাকাই নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়ায় তদন্তকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, এই সরঞ্জামগুলির মাধ্যমে আফতাব নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন কি না এবং করলে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন।
## হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম কলের আশঙ্কা
তদন্তকারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, জেলের ভিতর থেকে আফতাব কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
পুলিশের সন্দেহ, মোবাইল ব্যবহার করে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকতে পারেন। সেই যোগাযোগের ধরন ও সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এমনকী, পাকিস্তানে কোনও ফোন বা অনলাইন যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ধরনের যোগাযোগের অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং তার সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
## সেলের ভিতর ৩১ হাজার টাকা!
মোবাইল ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের পাশাপাশি আফতাবের সেল থেকে ৩১ হাজার টাকা নগদ উদ্ধার হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫০০ টাকার নোটে ওই টাকা সেলের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এত টাকা কীভাবে তাঁর কাছে এল, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।
জেলে থাকা কোনও বন্দির কাছে মোবাইল, রাউটার এবং নগদ টাকা কীভাবে পৌঁছল—এই তিনটি বিষয় এখন তদন্তকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## কারাকর্মীদের যোগ আছে কি?
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—জেলের ভিতরে এতগুলি সরঞ্জাম পৌঁছনোর পিছনে কোনও কারাকর্মীর সাহায্য ছিল কি না।
পুলিশ সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। কারণ তিনটি মোবাইল, রাউটার, ওয়াইফাই সরঞ্জাম, কার্ড রিডার, পেন ড্রাইভ এবং নগদ টাকা একসঙ্গে উদ্ধার হওয়ায় এগুলি কীভাবে নিরাপত্তা এড়িয়ে সেলে পৌঁছল, সেই প্রশ্ন উঠছে।
তদন্তকারীরা সরঞ্জামগুলির উৎস এবং জেলে সেগুলি পৌঁছনোর সম্ভাব্য পথ খুঁজে দেখছেন।
## প্রেসিডেন্সি জেলের নিরাপত্তা নিয়ে ফের প্রশ্ন
প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। তবে এবার একসঙ্গে একাধিক মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে।
জেলের মতো উচ্চ-নিরাপত্তার জায়গায় বন্দিদের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সরঞ্জাম পৌঁছে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়।
## এর আগেও একাধিক মোবাইল উদ্ধার
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দিদের হাতে মোবাইল থাকার বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপের কথা জানিয়েছিলেন।
এরপর তদন্তে একাধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের সুপার এবং চিফ কন্ট্রোলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল এবং সিআইডি তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তারপরও জেলবন্দিদের কাছ থেকে বারবার মোবাইল উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
## কে এই আফতাব আনসারি?
আফতাব আহমেদ আনসারি কলকাতার আমেরিকান সেন্টার হামলা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এবং পরে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০২ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হামলায় পাঁচজন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।
এছাড়াও খিদিরপুরের ব্যবসায়ী পার্থপ্রতিম রায় বর্মণ অপহরণ মামলাতেও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল এবং ওই মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই কারণেই জেলের ভিতর থেকে তাঁর মোবাইল ব্যবহারের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।
## জেলের ভিতর থেকে যোগাযোগ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
উচ্চ-নিরাপত্তার বন্দির হাতে মোবাইল পৌঁছে গেলে তা শুধু জেলবিধি লঙ্ঘনের বিষয় থাকে না। এর মাধ্যমে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ইন্টারনেট-সক্ষম ডিভাইস থাকলে সাধারণ ফোনকলের পাশাপাশি মেসেজিং অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা ব্যবহারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তাই আফতাবের সেল থেকে রাউটার ও ওয়াইফাই সংক্রান্ত সরঞ্জাম উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
## ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলি পরীক্ষা করা হবে
উদ্ধার হওয়া মোবাইল এবং অন্যান্য ডিভাইসগুলি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
ফোনগুলিতে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, কোন নম্বর বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং কখন সেগুলি সক্রিয় ছিল—এসব তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলির মাধ্যমে ঠিক কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
## হেস্টিংস থানায় মামলা
ঘটনার পর কারা কর্তৃপক্ষের তরফে হেস্টিংস থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা শুরু করেছে।
এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হবে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীগুলির উৎস, সেগুলি কীভাবে সেলে পৌঁছল এবং সেগুলি ব্যবহারের সঙ্গে অন্য কারও যোগ ছিল কি না, তা খুঁজে বের করা।
## প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনা ফের দেখিয়ে দিল, জেলের ভিতরে নিষিদ্ধ সামগ্রী প্রবেশ আটকানো প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত তল্লাশি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কারাকর্মীদের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও যদি একাধিক মোবাইল ও নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম বন্দির সেলে পৌঁছে যায়, তাহলে নিরাপত্তার ফাঁক কোথায় রয়েছে তা চিহ্নিত করা জরুরি।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ-ঝুঁকির বন্দিদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা আরও উদ্বেগজনক।
## তদন্তে এখন কোন প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হবে?
এই ঘটনার তদন্তে কয়েকটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
* তিনটি মোবাইল কীভাবে আফতাবের সেলে পৌঁছল?
* উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলি কে বা কারা সরবরাহ করেছিল?
* রাউটার ও ওয়াইফাই সরঞ্জাম কীভাবে জেলের ভিতরে এল?
* মোবাইলগুলি দিয়ে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল?
* হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল কি না?
* বিদেশে, বিশেষ করে পাকিস্তানে কোনও যোগাযোগ হয়েছিল কি না?
* জেলের কোনও কর্মী এই ঘটনায় যুক্ত ছিলেন কি না?
* উদ্ধার হওয়া ৩১ হাজার টাকা কোথা থেকে এল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই পুরো ঘটনার চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
## শেষ কথা
প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে আফতাব আহমেদ আনসারির সেল থেকে তিনটি মোবাইল, দুটি রাউটার, ওয়াইফাই সরঞ্জাম, কার্ড রিডার, পেন ড্রাইভ, ইয়ারফোন এবং ৩১ হাজার টাকা উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন, এই বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম কীভাবে জেলের ভিতরে পৌঁছল এবং সেগুলি ব্যবহার করে আফতাব কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। হেস্টিংস থানায় মামলা শুরু হওয়ায় তদন্তে সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খোঁজা হবে।
উদ্ধার হওয়া ডিভাইস ও অর্থের উৎস এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের তথ্য সামনে এলে ঘটনাটির পিছনে আরও কোনও বড় যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে। আপাতত তদন্তকারীদের নজর আফতাবের সেল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি ডিভাইস এবং সেগুলির সম্ভাব্য ব্যবহারের দিকে।


