দুর্গাপুজো মানেই কলকাতা ও শহরতলিতে বিপুল মানুষের ঢল। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে প্রতি বছরই লোকাল ট্রেনের উপর নির্ভর করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। পুজোর সেই বিপুল যাত্রীচাপের কথা মাথায় রেখে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করে দিল পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশন। পুজোর দিনগুলিতে শিয়ালদহ ও কলকাতা স্টেশনের সমস্ত টিকিট কাউন্টার **২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার পরিকল্পনা** নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অতিরিক্ত কর্মী, অটোমেটিক টিকিট ভেন্ডিং মেশিন এবং হাতে-ধরা টার্মিনালের মাধ্যমে টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
শুধু টিকিট ব্যবস্থাই নয়, যাত্রীদের নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, শৌচাগার, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিয়ালদহের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনার নেতৃত্বে প্রস্তুতি বৈঠকে এই বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
## পুজোয় ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে টিকিট কাউন্টার
পুজোর সময়ে স্টেশনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় টিকিট কাটার লম্বা লাইন। সেই সমস্যা কমাতেই এবার শিয়ালদহ ও কলকাতা স্টেশনের সমস্ত টিকিট কাউন্টার দিন-রাত খোলা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যাত্রীসংখ্যা আচমকা বেড়ে গেলে অতিরিক্ত বুকিং কর্মীও মোতায়েন করা হবে। ফলে রাতের দিকে বা ভোরবেলাতেও যাত্রীদের টিকিট কাটতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না।
## কাউন্টারের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা ATVM
শুধু সাধারণ টিকিট কাউন্টারের উপর নির্ভর না করে অটোমেটিক টিকিট ভেন্ডিং মেশিন বা **ATVM**-এর ব্যবহারও বাড়ানো হবে।
পুজোর দিনগুলিতে এই মেশিনগুলিও ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মেশিন ব্যবহারে যাত্রীদের সমস্যা হলে সাহায্য করার জন্য কর্মীও উপস্থিত থাকবেন। এর ফলে সাধারণ কাউন্টারের উপর চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করছে রেল।
## প্ল্যাটফর্মেই মিলবে টিকিট
ভিড় সামলানোর জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কর্মীরা হাতে-ধরা টার্মিনাল বা **HHT (Hand-Held Terminal)** নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
অর্থাৎ, প্রত্যেক যাত্রীকে টিকিটের জন্য কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতেই হবে—এমন নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী প্ল্যাটফর্ম বা যাত্রীদের ভিড়ের জায়গাতেই টিকিট দেওয়া সম্ভব হবে।
## গতবার একদিনে ২১ লক্ষ যাত্রীর চাপ
শিয়ালদহ ডিভিশনের এবারের প্রস্তুতির পিছনে রয়েছে গত বছরের অভিজ্ঞতা। গত দুর্গাপুজোয় শিয়ালদহ স্টেশনে একদিনে প্রায় **২১ লক্ষ যাত্রী** যাতায়াত করেছিলেন বলে রেল সূত্রে জানানো হয়েছে।
এবারও পুজোর সময়ে একই ধরনের বা তার থেকেও বেশি যাত্রীচাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে রেল। তাই শেষ মুহূর্তে ব্যবস্থা না নিয়ে আগে থেকেই পরিকাঠামো এবং কর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
## প্রবেশ ও বেরোনোর পথ আলাদা করার পরিকল্পনা
বিপুল ভিড়ের মধ্যে যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে স্টেশনে প্রবেশ এবং বেরোনোর পথ আলাদা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে শিয়ালদহের মতো ব্যস্ত স্টেশনে একই জায়গায় যাত্রীদের ঢোকা এবং বেরোনোর ব্যবস্থা থাকলে ভিড় আরও বেড়ে যায়। তাই যাত্রী প্রবাহকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
## মেল ও এক্সপ্রেস যাত্রীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ
শিয়ালদহ স্টেশনে মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ রাখার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
পুজোর সময়ে লোকাল ট্রেনের যাত্রী এবং দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রী—দুই ধরনের মানুষের চাপ একসঙ্গে তৈরি হয়। আলাদা প্রবেশপথ থাকলে এই দুই প্রবাহকে পৃথকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে মনে করছে রেল।
## বাড়ানো হবে নিরাপত্তা ও CCTV নজরদারি
পুজোর সময়ে স্টেশনে শুধু যাত্রীর সংখ্যাই বাড়ে না, নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও বাড়ে। সেই কারণে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং CCTV নজরদারি আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভিড়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী যাত্রীদের উদ্দেশে ঘোষণা করে তাঁদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
## দমদম স্টেশনেও বড় পরিবর্তন
দমদম স্টেশনেও যাত্রীদের সুবিধার জন্য পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ৪ এবং ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকের বুকিং কাউন্টার সরিয়ে সেখানে আরও বড় যাত্রী চলাচলের জায়গা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হল, পুজোর ভিড়ের সময়ে যাত্রীরা যাতে অপেক্ষা করতে এবং চলাচল করতে বেশি জায়গা পান।
## ব্যারাকপুরে নতুন বুকিং কাউন্টার
ব্যারাকপুর স্টেশনের রানাঘাট প্রান্তেও যাত্রীদের জন্য নতুন বুকিং কাউন্টার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই দিকে ফুট ওভারব্রিজের কাছে টিকিট কাউন্টার না থাকায় যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়।
সেই সমস্যা দূর করতেই নতুন কাউন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে রানাঘাট প্রান্তের ফুট ওভারব্রিজও দ্রুত যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
## শিয়ালদহ, দমদম ও বালিগঞ্জে আধুনিক শৌচাগার
পুজোর সময়ে স্টেশনগুলিতে শৌচাগার নিয়েও যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কথা মাথায় রেখে শিয়ালদহ, দমদম এবং বালিগঞ্জ স্টেশনে আধুনিক শৌচাগার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যাত্রী পরিষেবার মান উন্নত করার পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে থাকা মানুষদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়াও এর অন্যতম লক্ষ্য।
## বিধাননগর সাবওয়েরও উন্নয়ন
বিধাননগর স্টেশনের সাবওয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও করা হচ্ছে। পুজোর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে স্টেশনে যাত্রীদের চলাচল আরও স্বচ্ছন্দ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
## জরুরি পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি
শুধু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভিড় সামলানো নয়, কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে দ্রুত যাত্রীদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হবে, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার পথ, চিকিৎসা পরিষেবা এবং বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
## রেলের লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ পুজো যাত্রা
শিয়ালদহ ডিভিশনের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনার নেতৃত্বে হওয়া বৈঠকে মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং যাত্রীবান্ধব পুজোর যাতায়াত নিশ্চিত করা।
গত বছরের বিপুল ভিড়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। টিকিট পরিষেবা থেকে শুরু করে নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিষেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করছে রেল।
## পুজোর যাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তি
দুর্গাপুজোর সময়ে কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল মানুষ শিয়ালদহ ডিভিশনের লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে রাত পর্যন্ত প্যান্ডেল হপিং চলায় গভীর রাতেও স্টেশনে যাত্রীদের চাপ থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টা টিকিট কাউন্টার এবং ATVM চালু রাখা হলে যাত্রীদের জন্য তা নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা হতে পারে। পাশাপাশি HHT-এর মাধ্যমে সরাসরি টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইনও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
## শেষ কথা
দুর্গাপুজোর বিপুল ভিড় সামলাতে এবার আগে থেকেই কোমর বেঁধে নামছে পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশন। শিয়ালদহ ও কলকাতা স্টেশনের সমস্ত টিকিট কাউন্টার **২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা**, ATVM চালু রাখা এবং HHT-এর মাধ্যমে অন-দ্য-স্পট টিকিট দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি দমদম ও ব্যারাকপুরে নতুন করে যাত্রী পরিসর ও বুকিং কাউন্টার তৈরি, শিয়ালদহ-দমদম-বালিগঞ্জে আধুনিক শৌচাগার, CCTV নজরদারি, অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী এবং জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।
গত বছর একদিনে প্রায় ২১ লক্ষ যাত্রীর চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রেলের লক্ষ্য একটাই—**পুজোয় ভিড় থাকবে, কিন্তু যাত্রী পরিষেবায় যেন বিশৃঙ্খলা না হয়।**


