কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই বড় বাজেট, চোখধাঁধানো মণ্ডপ, থিমের অভিনবত্ব আর তারকা সমাগম। কিন্তু **২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় সেই চেনা ছবিতে বদল আসতে চলেছে**। রাজ্যে পালাবদলের পর একাধিক বড় পুজো কমিটিতে পরিবর্তন এসেছে, আর তার প্রভাব পড়ছে পুজোর বাজেটেও। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা—বেশ কয়েকটি পরিচিত পুজো এবার তুলনামূলক ছোট পরিসরে আয়োজনের পথে।
Sangbad Pratidin-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে যে সব পুজোর বাজেট লাখ পেরিয়ে কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, চলতি বছরে সেগুলির একাংশে বড়সড় কাটছাঁট হচ্ছে। কোথাও কমছে মণ্ডপের আকার, কোথাও থিমে কাটছাঁট, আবার কোথাও জাঁকজমক ছেড়ে সাবেকি আয়োজনের দিকে ফিরছে কমিটি।
## কেন কমছে পুজোর বাজেট?
এই পরিবর্তনের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে **পুজোর অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্যোগ**।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের সময়ে বহু পুজোর সঙ্গে নেতা, মন্ত্রী বা কাউন্সিলরের নাম জড়িয়ে থাকত। নতুন কমিটিগুলির অভিযোগ, কয়েকটি ক্ষেত্রে আগের বছরগুলিতে আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব বা অডিট নিয়েও প্রশ্ন ছিল। এবার পুজোর অর্থব্যবস্থায় নিয়মকানুন ও স্বচ্ছতার উপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি অনুদান নিয়েও এবার অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তুলনামূলক কম বাজেটের পুজোগুলিকে প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাহায্য করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলির জন্য আগের মতো বিপুল অর্থের সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
—
## দমদম দক্ষিণপাড়া সর্বজনীনে জাঁকজমকে ভাটা
উত্তর কলকাতার দমদম এলাকার **দক্ষিণপাড়া সর্বজনীন** গত কয়েক বছরে দ্রুত বড় হয়ে উঠেছিল। বিশাল মণ্ডপ, বড় প্রতিমা, তারকা উপস্থিতি এবং আলোকসজ্জায় পুজোর জৌলুস নজর কাড়ত।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই জাঁকজমকে কাটছাঁটের ইঙ্গিত মিলছে। আগের মতো বিপুল আয়োজন না করে তুলনামূলক ছোট পরিসরে পুজো করার প্রস্তুতি চলছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
—
## বনহুগলির ন’পাড়া দাদাভাই সংঘেও বদল
গত দু’বছর ধরে **বনহুগলির ন’পাড়া দাদাভাই সংঘের** পুজোও বেশ নজর কেড়েছিল।
মণ্ডপ এবং থিমের জাঁকজমকে এই পুজো অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিত। কিন্তু এবার পুজোর অনেক আগে থেকেই সেখানে আগের মতো প্রস্তুতির ছবি দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ এখানেও বাজেট ও আয়োজন কমার সম্ভাবনা স্পষ্ট।
—
## অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাবেও বাজেট কমছে
অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাবের পুজো গত কয়েক বছরে শিল্পী **ভবতোষ সুতার**-এর কাজের জন্য বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিল। গলির পুজো থেকে তা বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল এবং একাধিক পুরস্কারও পেয়েছিল।
এবার অবশ্য পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
ক্লাবের তরফে জানানো হয়েছে, প্রথমে বড় আকারে পুজো করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পুলিশ পরিদর্শনের পর বড় করে পুজো করার অনুমতি মেলেনি। ফলে বাজেট কমিয়ে থিম তৈরি করা হচ্ছে। এবার শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন **সুবিন ভট্টাচার্য এবং শম্পা ভট্টাচার্য**।
—
## শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবে বদল সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো
লেকটাউনের **শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব** কলকাতার সবচেয়ে আলোচিত বড় বাজেটের পুজোগুলির অন্যতম।
বছরের পর বছর এখানে বিশাল মণ্ডপ, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, লেজার শো এবং অলংকারে সজ্জিত প্রতিমা দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই ছবিতে বড় পরিবর্তন আসছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুজোর নতুন কমিটি বাজেট কমিয়ে স্থানীয় মানুষকে নিয়ে তুলনামূলক ঘরোয়া ভাবে পুজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে আগের সেই বিশাল মণ্ডপ, লেজার শো কিংবা প্রতিমার বিপুল অলংকার এবার দেখা নাও যেতে পারে।
—
## সল্টলেক ও দক্ষিণদাড়িতেও কাটছাঁট
সল্টলেকের একাধিক পুজো এবং লেকটাউনের **দক্ষিণদাড়ি সর্বজনীন**-এর আয়োজনও আগের তুলনায় ছোট হতে পারে বলে খবর।
অর্থাৎ, শুধু একটি বা দুটি কমিটি নয়—কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের পরিবর্তনের ছবি দেখা যাচ্ছে।
## দক্ষিণ কলকাতায় কি একই ছবি?
উত্তর কলকাতার মতো দক্ষিণ কলকাতার সব বড় পুজো অবশ্য বাজেট কমাচ্ছে না।
**চেতলা অগ্রণী** এবং **সুরুচি সংঘ**-এর মতো জনপ্রিয় পুজোগুলিতে এখনও আগের মতোই জাঁকজমক বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুরুচি সংঘের ক্ষেত্রে অবশ্য কমিটি এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন কমিটি জানিয়েছে, পুজোর সময় মাঠ ব্যবহারের জন্য বৈধভাবে LIC-এর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, সব বড় পুজো ছোট হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। বরং **পুজো কমিটির পরিস্থিতি ও অর্থের উৎস অনুযায়ী পরিবর্তনের মাত্রা আলাদা হচ্ছে।**
—
## পূর্বাচল শক্তি সংঘে হতাশ হতে পারেন দর্শকরা
দক্ষিণ কলকাতার **পূর্বাচল শক্তি সংঘ**-এর পুজোও বহু দর্শকের কাছে পরিচিত।
তবে ২০২৬ সালে আগের মতো জাঁকজমক না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যাঁরা প্রতি বছর বড় আয়োজনের প্রত্যাশায় এই পুজো দেখতে যান, তাঁরা কিছুটা হতাশ হতে পারেন।
—
## কেন্দুয়া শান্তি সংঘেও কমিটি বদল
প্রাক্তন কাউন্সিলর **বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তের গ্রেপ্তারের** পর কেন্দুয়া শান্তি সংঘের পুজোর ব্যবস্থাপনাতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীতে নতুন কমিটি খুঁটিপুজো করেছে ধুমধাম করে। তবে সেই জাঁকজমক মূল পুজোয় কতটা দেখা যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
—
# থিম ছেড়ে সাবেকি পুজোয় ফিরছে অনেক কমিটি
বাজেট কমার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে **থিমের পুজোয়**।
কলকাতার পুজো গত এক দশকে থিমের জন্য গোটা দেশের কাছে পরিচিত হয়েছে। বাঁশ, কাঠ, কাপড়, ধাতু, কাগজ কিংবা বিভিন্ন অভিনব উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল মণ্ডপ।
কিন্তু বড় থিম মানেই বড় বাজেট।
ফলে এবার বেশ কিছু কমিটি ব্যয়বহুল থিমের বদলে **সাবেকি বা ঐতিহ্যবাহী পুজোর** দিকে ফিরছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
—
## কুমোরটুলিতেও প্রভাব স্পষ্ট
কলকাতার দুর্গাপুজোর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে ভালো বোঝা যাচ্ছে **কুমোরটুলিতে**।
মৃৎশিল্পী নবকুমার পাল জানিয়েছেন, গত বছর তিনি ১২টি থিমের প্রতিমার বরাত পেয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা কমে হয়েছে মাত্র **৬টি**—অর্থাৎ এক বছরে অর্ধেক।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ থিমের প্রতিমার সঙ্গে শিল্পী, মণ্ডপসজ্জা, পরিবহণ এবং অন্যান্য বহু শিল্পীর কাজও জড়িত থাকে।
—
## প্রতিমার মাটির দাম বাড়লেও বাড়েনি দাম
আরও একটি সমস্যা রয়েছে মৃৎশিল্পীদের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরির মাটির দাম যে হারে বেড়েছে, সেই অনুপাতে প্রতিমার দাম বাড়েনি। ফলে একদিকে পুজো কমিটিগুলির বাজেট কমছে, অন্যদিকে শিল্পীদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
এর ফলে কুমোরটুলির শিল্পীদের উপরও আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
—
# পুজোর অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি কলকাতার বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত।
পুজোর সঙ্গে যুক্ত—
* মৃৎশিল্পী
* মণ্ডপশিল্পী
* আলোকসজ্জা কর্মী
* ইলেকট্রিশিয়ান
* ঢাকি
* পুরোহিত
* ফুল ব্যবসায়ী
* কাপড় ও সাজসজ্জার ব্যবসায়ী
* ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা
* নিরাপত্তাকর্মী
* ক্যাটারিং সংস্থা
* পরিবহণ কর্মী
ফলে বড় পুজোর বাজেট কমলে তার প্রভাব শুধু ক্লাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; গোটা পুজো-নির্ভর অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
—
# সরকারি অনুদান নিয়েও ধোঁয়াশা
২০২৬ সালে দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদান নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, আগের মতো সব পুজো কমিটিকে একইভাবে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে **প্রয়োজনের ভিত্তিতে কম বাজেটের পুজোগুলিকে সাহায্য করার** কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও পরিষ্কার নয়।
এদিকে পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে সেপ্টেম্বরের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকের সম্ভাবনার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। সেই বৈঠকের পর অনুদান নিয়ে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
—
# রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুজোর নতুন ছবি?
২০২৬ সালের পুজো কলকাতার জন্য শুধু সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বছর নয়, **পুজো পরিচালনার ক্ষেত্রেও একটি পরিবর্তনের বছর**।
সরকার বদলের পর একাধিক বড় পুজো কমিটিতে সাংগঠনিক পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বদলে পুজোকে স্থানীয় মানুষের উৎসব হিসেবে রাখার কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাজেট কমার সম্পর্ক কতটা সরাসরি, তা প্রতিটি পুজোর ক্ষেত্রে আলাদা করে দেখতে হবে।
—
# কলকাতার পুজোয় কি এবার পুরনো দিনের আবহ ফিরবে?
এক অর্থে ২০২৬ সালের পুজোয় কলকাতা হয়তো কিছুটা **সাবেকি দুর্গাপুজোর দিকে ফিরতে পারে**।
বড় থিমের বদলে একচালা প্রতিমা, সাধারণ মণ্ডপ, স্থানীয় শিল্পীদের কাজ এবং পাড়ার মানুষের অংশগ্রহণ—এই চিত্র আরও বেশি দেখা যেতে পারে।
তবে কলকাতার বড় পুজোর দর্শকসংখ্যা এবং জনপ্রিয়তা বিবেচনায় অনেক কমিটি এখনও বড় আয়োজন ধরে রাখার চেষ্টা করবে। তাই পুরো শহরজুড়ে একেবারে জাঁকজমকহীন পুজো হবে, এমনটা বলা যাবে না।
—
# শেষ কথা
২০২৬ সালের কলকাতার দুর্গাপুজোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত **বাজেট এবং পুজো পরিচালনার ধরনে**।
উত্তর কলকাতার দক্ষিণপাড়া সর্বজনীন, ন’পাড়া দাদাভাই সংঘ, অর্জুনপুর আমরা সবাই কিংবা লেকটাউনের শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব—একাধিক পরিচিত পুজোয় আয়োজন ছোট করার খবর সামনে এসেছে।
অন্যদিকে চেতলা অগ্রণী বা সুরুচি সংঘের মতো কিছু বড় পুজো এখনও জাঁকজমক বজায় রাখার পথে রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কুমোরটুলির শিল্পীদের কাজেও এর প্রভাব পড়েছে—একজন শিল্পীর থিমের প্রতিমার বরাত গত বছরের তুলনায় ১২ থেকে কমে ৬ হয়েছে।
তাই ২০২৬-এর পুজো হয়তো কলকাতাকে একটি নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে—**বড় বাজেট আর চোখধাঁধানো থিমই কি পুজোর আসল আকর্ষণ, নাকি কম খরচে পাড়ার মানুষের অংশগ্রহণেই ফিরে আসতে পারে শারদোৎসবের পুরনো আবহ?**


