**অপারেশন সিঁদুর** নিয়ে এক বছর পর সামনে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাকিস্তানের কিরানা হিলস এলাকায় একটি ভারতীয় লইটারিং মিউনিশন বা ড্রোন আছড়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ (CDS) জেনারেল অনিল চৌহান। তবে এটি কোনওভাবেই কিরানা হিলসের পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা ছিল না—ড্রোনটি লক্ষ্য খুঁজতে গিয়ে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে সেখানে আঘাত করেছিল বলে তাঁর ব্যাখ্যা।
## কিরানা হিলসে কী হয়েছিল?
২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানের সারগোধা অঞ্চলের কাছে ভারতীয় লইটারিং মিউনিশন মোতায়েন করা হয়েছিল। এগুলির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি রাডার খুঁজে ধ্বংস করা।
জেনারেল অনিল চৌহানের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ভারতীয় ড্রোন সারগোধার আশপাশে রাডার খুঁজছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে না পাওয়ার পর সেটির জ্বালানি প্রায় শেষ হয়ে আসে। এরপর সেটি কিরানা হিলস এলাকায় গিয়ে আঘাত করে।
অর্থাৎ, **কিরানা হিলসকে আগে থেকে নির্দিষ্ট টার্গেট করা হয়নি।**
## কিরানা হিলস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সারগোধার কাছে অবস্থিত কিরানা হিলস দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের সামরিক ও পরমাণু পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনায় রয়েছে।
ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলের সঙ্গে পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে। অতীতে সেখানে সাব-ক্রিটিক্যাল পরমাণু পরীক্ষা চালানো হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এই কারণেই অপারেশন সিঁদুরের সময় কিরানা হিলসে কোনও হামলা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।
## আগে অবশ্য ভারত হামলার কথা অস্বীকার করেছিল
এই ঘটনাটি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে **কিরানা হিলসের পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কোনও হামলা চালানো হয়নি**। ভাইস চিফ অফ এয়ার স্টাফ এয়ার মার্শাল নাগেশ কাপুরও জানিয়েছিলেন, অপারেশন সিঁদুরে ভারতীয় বাহিনীর লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনা।
এখন জেনারেল অনিল চৌহানের বক্তব্যে সেই অবস্থানই আরও পরিষ্কার হয়েছে—**এলাকায় আঘাত হয়েছিল, কিন্তু সেটি পরিকল্পিত টার্গেট ছিল না।**
## কেন কিরানা হিলসে পৌঁছে গেল ড্রোন?
প্রাক্তন CDS-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ড্রোনটি সারগোধার আশপাশে রাডার খুঁজছিল। কিরানা হিলস সারগোধা থেকে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
লইটারিং মিউনিশন নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে বের করার জন্য এলাকায় ঘুরছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট রাডার লক্ষ্য না পাওয়ায় সেটির জ্বালানি শেষের দিকে চলে আসে। সেই পরিস্থিতিতে ড্রোনটি কিরানা হিলস এলাকায় গিয়ে আঘাত করে বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
## কোন ধরনের ড্রোন ছিল?
প্রতিবেদনগুলিতে এটিকে একটি **লইটারিং মিউনিশন** হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সম্ভবত ইজরায়েলি নকশার **Harop** ধরনের ড্রোন হতে পারে বলে NDTV জানিয়েছে।
লইটারিং মিউনিশন সাধারণ ড্রোনের মতো শুধু নজরদারি করে না। এগুলি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘুরে লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে নিজেই লক্ষ্যবস্তুর উপর আঘাত হানতে পারে।
## পরমাণু দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল কি?
কিরানা হিলসকে পাকিস্তানের পরমাণু পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয় বলে এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে **কোনও পরমাণু বিস্ফোরণ বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেনি**। আগের তদন্ত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রিপোর্টেও পাকিস্তানের কোনও পরমাণু স্থাপনা থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই ঘটনাটি সামরিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটিকে কোনও পরমাণু হামলা বা পরমাণু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
## অপারেশন সিঁদুরের বড় প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের সময় অপারেশন সিঁদুর পরিচালনা করেছিল ভারত। এর আগে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।
পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক সামরিক সংঘর্ষ হয় এবং বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলিও লক্ষ্যবস্তু হয়।
কিরানা হিলসের ঘটনা সেই সামরিক অভিযানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এতদিন অস্পষ্ট থাকা অধ্যায়।
## ভুল করে পরমাণু এলাকায় আঘাত—কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হল, কিরানা হিলসের মতো সংবেদনশীল এলাকার কাছে সামরিক অভিযানের সময় একটি অস্ত্রের অনিচ্ছাকৃত আঘাতও বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।
বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশই পরমাণু শক্তিধর হওয়ায় কোনও পরমাণু-সম্পর্কিত স্থাপনার কাছে সামরিক হামলা হলে ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে।
তবে জেনারেল চৌহানের বক্তব্যে স্পষ্ট যে ভারত **পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়নি**।
## ‘টার্গেট’ আর ‘আঘাত’—দুটির মধ্যে পার্থক্য
এই ঘটনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
**কিরানা হিলসে আঘাত হয়েছিল**—প্রাক্তন CDS-এর বক্তব্যে সেটি স্বীকার করা হয়েছে।
কিন্তু **কিরানা হিলসকে লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়েছিল**—এমন দাবি তিনি করেননি।
বরং তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রোনটি রাডার খুঁজছিল এবং জ্বালানি কমে যাওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিরানা হিলস এলাকায় আঘাত করে।
এই পার্থক্যই গোটা ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
## শেষ কথা
অপারেশন সিঁদুরের এক বছর পর কিরানা হিলস নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হল। প্রাক্তন CDS জেনারেল অনিল চৌহান জানিয়েছেন, **একটি ভারতীয় লইটারিং মিউনিশন কিরানা হিলস এলাকায় আঘাত করেছিল**। কিন্তু সেটি পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা ছিল না। ড্রোনটি সারগোধার কাছে রাডার খুঁজছিল এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে কিরানা হিলস এলাকায় গিয়ে আঘাত করে।
ঘটনাটি আরও একবার দেখিয়ে দিল, দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে সামরিক অভিযানে **লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর গুরুত্ব কতটা বেশি**।


