পড়ুয়া নেই, দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রয়েছে একের পর এক সরকারি স্কুল। সেই স্কুলগুলির ভবন, জমি এবং মাঠ কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে রাজ্য সরকারের উদ্যোগ ঘিরেই এবার তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। ৯৩৩টি সরকারি স্কুল একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল বিরোধীরা। তবে সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখনই কোনও স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং যে স্কুলগুলিতে পড়ুয়া রয়েছে, সেগুলি কোনওভাবেই বন্ধ করা হবে না। পাশাপাশি পড়ুয়াহীন স্কুলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব কি না, সেটিও আগে খতিয়ে দেখা হবে।
রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে ৯৩৩টি সরকারি স্কুল। তালিকায় রয়েছে প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলির অনেকগুলিতেই দীর্ঘদিন ধরে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য অথবা অত্যন্ত কম। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত স্কুলগুলির বেশিরভাগেই গত পাঁচ বছরে একজন পড়ুয়াও ভর্তি হয়নি। আবার কিছু স্কুল দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে ব্যবহার না হওয়ায় স্কুলের ভবন, জমি এবং অন্যান্য পরিকাঠামোও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার সরাসরি স্কুল তুলে দেওয়ার পথে না গিয়ে প্রথমে পরিস্থিতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যের ২৩ জন জেলাশাসককে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির কাজ হবে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলির বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা। কোথায় স্কুলে পড়ুয়া নেই, কোথায় পড়ুয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম, কোথায় স্কুল পুনরায় চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোথায় স্কুলের জমি বা ভবন অন্য সরকারি কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখবে কমিটি।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ এখনই ৯৩৩টি স্কুলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের তথ্য হাতে পাওয়ার পরই প্রতিটি স্কুল সম্পর্কে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে একই তালিকায় থাকা সব স্কুলের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।
স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্যেও সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বিরোধীদের অভিযোগ খারিজ করে জানিয়েছেন, স্কুলগুলি তুলে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমে দেখা হবে সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় কি না। কোনও স্কুলে পড়ুয়া থাকলে সেই স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক এবং পরিকাঠামোর ব্যবস্থা রাজ্য করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে পড়ুয়া থাকা স্কুলের ক্ষেত্রে বন্ধ করে দেওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই বলেই সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এতগুলি স্কুলে পড়ুয়া নেই কেন? গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় সরকারি স্কুলই ছিল স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার প্রধান ভরসা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যার পরিবর্তন, পরিবারগুলির স্থানান্তর, ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি স্কুলের প্রতি আগ্রহ এবং একাধিক স্কুলের ভৌগোলিক অবস্থানের মতো নানা কারণে কিছু সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমে যেতে পারে। কোথাও আবার কাছাকাছি একাধিক স্কুল থাকার ফলে পড়ুয়ারা একটি নির্দিষ্ট স্কুলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে প্রতিটি স্কুলের সমস্যার কারণ এক নয়। এই কারণেই মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, যেখানে পড়ুয়া রয়েছে সেখানে স্কুল চালু থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক ও পরিকাঠামো দেওয়া হবে। কিন্তু যেখানে বছরের পর বছর কোনও পড়ুয়া ভর্তি হয়নি, সেই স্কুলগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহার না হলে সরকারি সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুলের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে এবং অন্যান্য পরিকাঠামোও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই অব্যবহৃত সম্পত্তিকে অন্য সরকারি কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রয়োজনে স্কুলের ভবন, জমি বা মাঠ ব্যবহার করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। আলোচনায় এসেছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাণিসম্পদ বা কৃষি-সংক্রান্ত কেন্দ্র এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক ব্যবহারের সম্ভাবনাও। তবে কোন স্কুলে কী ধরনের ব্যবহার হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
এখানেই বিরোধীদের আপত্তি। তাদের অভিযোগ, স্কুলের পড়ুয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যা সমাধান করার পরিবর্তে সরকার স্কুলের সম্পত্তিকে অন্য কাজে ব্যবহার করার কথা ভাবছে। ৯৩৩টি স্কুলকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত সেখান থেকেই। সরকারের বক্তব্য, স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হয়নি; বরং অব্যবহৃত সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার এবং পড়ুয়াহীন স্কুলগুলিকে পুনরায় সক্রিয় করার সম্ভাবনা—দুই দিকই বিবেচনা করা হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এই সিদ্ধান্তের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষক নিয়োগ এবং পরিকাঠামো। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যে স্কুলগুলিতে ছাত্রছাত্রী রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক এবং পরিকাঠামো দেওয়ার ব্যবস্থা করবে রাজ্য। অর্থাৎ পড়ুয়া থাকা সরকারি স্কুলগুলির ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান আপাতত পরিষ্কার—সেগুলি চালু থাকবে।
অন্যদিকে, কোনও এলাকায় যদি একাধিক সরকারি স্কুল পাশাপাশি থাকে এবং তার মধ্যে একটি স্কুলেই অধিকাংশ পড়ুয়া ভর্তি হয়, তাহলে অব্যবহৃত বা প্রায় পড়ুয়াহীন স্কুলের ক্ষেত্রে কী করা যায়, তা নিয়েও চিন্তা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় যদি একটি স্কুলই শিশুদের জন্য কার্যকর শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, তাহলে অন্য স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। মন্ত্রীও জানিয়েছেন, কোথায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি বুঝেই বিবেচনা করা হবে।
এদিকে ৯৩৩টি স্কুলের বিষয়টি সামনে আসতেই রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, এত বিপুল সংখ্যক স্কুল পড়ুয়াহীন হয়ে পড়ার কারণ খতিয়ে দেখে সেখানে নতুন করে পড়ুয়া আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তাদের মতে, সরকারি স্কুলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো এবং শিক্ষার মান উন্নত করাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।
সরকার অবশ্য বলছে, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা হবে। ২৩ জেলাশাসককে নিয়ে গঠিত কমিটির ৩০ দিনের রিপোর্ট সেই কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিপোর্টে যদি দেখা যায় কোনও স্কুলে আবার পড়ুয়া ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর যদি কোনও স্কুল দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ পড়ুয়াহীন থাকে এবং পুনরায় চালুর বাস্তব সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে সেই স্কুলের জমি ও ভবন অন্য জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, স্কুলের জমি ও ভবনের বিকল্প ব্যবহার কতটা কার্যকর হবে? সরকারি সম্পত্তি তৈরি করতে বিপুল অর্থ খরচ হয়। বহু বছর ধরে কোনও সম্পত্তি অব্যবহৃত পড়ে থাকলে তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সম্পত্তিকে রক্ষণাবেক্ষণ করে জনস্বার্থে ব্যবহার করা গেলে সরকারের যুক্তিতে তার একটি প্রশাসনিক মূল্য রয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের শিক্ষার প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষেত্রে স্কুলের গুরুত্ব শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সরকারি স্কুল স্থানীয় মানুষের কাছে একটি সামাজিক পরিকাঠামোও। স্কুলের মাঠ, ভবন এবং অন্যান্য সুবিধা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়। ফলে কোনও স্কুলের ছাত্রসংখ্যা কম হলেও ভবিষ্যতে সেখানে পড়ুয়া বাড়ার সম্ভাবনা আছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
রাজ্য সরকারের সামনে তাই মূলত দু’টি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, যে স্কুলগুলিতে এখনও পড়ুয়া রয়েছে, সেগুলিতে যথেষ্ট শিক্ষক ও পরিকাঠামো নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে পড়ুয়াহীন স্কুলগুলির ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যাতে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট না হয় এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থও ক্ষুণ্ণ না হয়।
এই পরিস্থিতিতে ৩০ দিনের মধ্যে কমিটির রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে। প্রতিটি জেলার পরিস্থিতি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে রিপোর্ট তৈরি হলে ৯৩৩টি স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে কোন স্কুল পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব, কোন স্কুলের পরিকাঠামো অন্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং কোন স্কুলের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে আপাতত স্কুলশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—৯৩৩টি স্কুল একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ার কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেই। বরং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথমে স্কুলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। আর যে স্কুলগুলিতে ছাত্রছাত্রী রয়েছে, সেগুলিকে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো দিয়ে চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
ফলে ৯৩৩টি সরকারি স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনই মিলছে না। ৩০ দিনের সমীক্ষা এবং জেলা প্রশাসনের রিপোর্টের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট হবে। আপাতত সরকারের বক্তব্য, স্কুল বন্ধ নয়, বরং পড়ুয়াহীন প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ কীভাবে সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়, সেটিই মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি যেখানে পড়ুয়া রয়েছে, সেই স্কুলগুলির শিক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আশ্বাসও দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন।


