বাবাকে হারানোর গভীর শোকের মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে নারাজ বাঁকুড়ার তরুণ শেখ আবদুল হাফিজ। পরিবারের আর্থিক সংকট মেটাতে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সাহায্য চান না তিনি। বরং তাঁর দাবি, সরকার যদি সত্যিই তাঁদের পরিবারের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে, তাহলে বাংলার যে কোনও প্রান্তে তাঁর প্রয়াত বাবার নামে একটি বিশ্বমানের স্কুল তৈরি করা হোক। সেই স্কুলে যেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের পড়ুয়ারা বিনামূল্যে উন্নতমানের শিক্ষা পেতে পারে।
বাঁকুড়ার ইন্দাসের করিশুন্ডা গ্রামের এই ঘটনা ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। শিক্ষা পরিকাঠামোর বেহাল দশা নিয়ে সরব হওয়া এবং নিজের পুরনো স্কুলের পরিস্থিতি তুলে ধরার পরই হামলার অভিযোগ ওঠে হাফিজ ও তাঁর পরিবারের উপর। সেই ঘটনায় গুরুতর আহত হন তাঁর বাবা শেখ মাফিক। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
## বাবাকে হারিয়েও শিক্ষা আন্দোলনের লক্ষ্য অটুট
শেখ আবদুল হাফিজের কাছে তাঁর বাবার মৃত্যু নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত শোককে তিনি নিজের বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্য থেকে আলাদা করে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছেন। তাই তাঁর বাবার মৃত্যুর পরেও সেই কাজ থামাতে চান না।
বরং প্রয়াত বাবার স্মৃতিকে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করতে চান তিনি। সেই কারণেই আর্থিক সাহায্যের পরিবর্তে একটি স্কুল তৈরির দাবি তুলেছেন।
হাফিজের কথায়, সরকার যদি মনে করে তাঁদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে দেওয়ার পরিবর্তে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হোক, যার সুফল বহু মানুষ পাবেন।
## ‘আর্থিক সাহায্য চাই না’, স্পষ্ট হাফিজ
সোমবার সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে হাফিজ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন। তাঁর দাবি, পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্য পাওয়ার পরিবর্তে সরকার যেন বাংলার যে কোনও জায়গায় একটি উন্নতমানের স্কুল তৈরি করে।
সেই স্কুলের নাম তাঁর প্রয়াত বাবা শেখ মাফিকের নামে রাখার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
শুধু স্কুল তৈরি করলেই হবে না, তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। সেই স্কুলে যেন সকল পড়ুয়া বিনামূল্যে ভালো শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়।
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের বদলে একটি বৃহত্তর সামাজিক সম্পদ তৈরির দাবি তুলেছেন হাফিজ। তাঁর এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহু মানুষ তাঁর এই অবস্থানের প্রশংসা করছেন।
## কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ঘটনা?
ঘটনার সূত্রপাত ইন্দাসের করিশুন্ডা গ্রামে। হাফিজ তাঁর পুরনো স্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুলে গিয়ে তিনি সেখানকার বেহাল পরিকাঠামো দেখতে পান।
স্কুলের ভবন, পরিবেশ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সেই অবস্থার ছবি ও ভিডিও করার উদ্যোগ নেন তিনি।
এই কাজটি ছিল তাঁর বৃহত্তর ‘School Thik Karo’ উদ্যোগের অংশ। লক্ষ্য ছিল সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনের নজরে আনা।
কিন্তু অভিযোগ, স্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও করার পরই তাঁকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
## বাড়িতে হামলার অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, হাফিজ বাড়িতে ফেরার পর একদল দুষ্কৃতী সেখানে হামলা চালায়। সেই সময় তাঁর বাবা ছেলেকে বাঁচাতে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
হামলায় গুরুতরভাবে আহত হন শেখ মাফিক। ছেলেকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিজেই আক্রান্ত হন বলে অভিযোগ।
পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্ধমানের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
## ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হাফিজ
হাফিজ শুধু নিজের গ্রামের স্কুলের সমস্যার কথা তুলে ধরেননি। তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের দাবিতে ‘Cockroach Janta Party’ বা CJP-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছিলেন।
CJP-র ‘School Thik Karo’ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য হল সরকারি স্কুলগুলির বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানানো।
এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই নিজের পুরনো স্কুলে গিয়েছিলেন হাফিজ।
সেখানে স্কুলের অবস্থা দেখে তিনি প্রধান শিক্ষক এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।
## নিজের স্কুলের দুরবস্থা দেখে উদ্যোগ
একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের স্কুলের দুরবস্থা হাফিজের কাছে আরও বেশি কষ্টের ছিল। যে স্কুলে পড়াশোনা করে তাঁর ভবিষ্যৎ গড়ে উঠেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকে, তাহলে বর্তমান পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এই প্রশ্নই তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
এই ভাবনা থেকেই স্কুলের ছবি ও ভিডিও করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তাঁর লক্ষ্য ছিল সমস্যাগুলি সামনে আনা এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
কিন্তু সেই উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত এমন একটি ঘটনার জন্ম দেয়, যার ফলে তিনি বাবাকে হারিয়েছেন।
## বাবার স্মৃতিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে চান
বাবার মৃত্যুর পরও হাফিজের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, তিনি ব্যক্তিগত সুবিধার বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগের কথা বলেছেন।
তিনি চান, তাঁর বাবার নামে এমন একটি স্কুল তৈরি হোক, যেখানে অর্থের অভাবে কোনও শিশু ভালো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।
একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির জায়গা থেকে এমন একটি বৃহত্তর সামাজিক দাবির উত্থানই হাফিজের বক্তব্যকে আলাদা করে তুলেছে।
## মায়েরও একই দাবি
শুধু হাফিজ নন, তাঁর মায়ের বক্তব্যও একই। পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যের পরিবর্তে তাঁরাও চান একটি ভালো স্কুল তৈরি হোক।
এই অবস্থান পরিবারের সদস্যদের কাছে শিক্ষার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
প্রিয়জনকে হারানোর পর সাধারণত পরিবার আর্থিক সাহায্যের দিকে তাকায়। কিন্তু হাফিজের পরিবার সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শিক্ষা পরিকাঠামো তৈরির দাবি তুলেছে।
## সিপিএম নেতারাও গিয়েছিলেন বাড়িতে
হাফিজের বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বাড়িতে যান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। সোমবার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা-সহ বেশ কয়েকজন তাঁর বাড়িতে যান।
এর পাশাপাশি সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ এবং এসএফআইয়ের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাসও পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।
তাঁরা পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
## আর্থিক সাহায্যের পরামর্শ ফিরিয়ে দিলেন
পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অনেকেই হাফিজকে সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য বা ক্ষতিপূরণের দাবি জানানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি হাফিজ।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের পরিবারের জন্য টাকা প্রয়োজন নেই। বরং যদি সরকার তাঁদের পরিবারের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে চায়, তাহলে এমন একটি স্কুল তৈরি করা হোক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাজে আসবে।
এই বক্তব্যই এখন তাঁর দাবির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
## ‘বিশ্বমানের স্কুল’ কেন চাইছেন হাফিজ?
হাফিজের দাবি শুধুমাত্র একটি স্কুল ভবন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান একটি ‘বিশ্বমানের’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এর অর্থ, আধুনিক পরিকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ, উন্নত লাইব্রেরি, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা।
তাঁর মতে, ভালো শিক্ষা সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
তাই বাবার নামে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে সেটিই তাঁর বাবার স্মৃতির সবচেয়ে বড় সম্মান হবে বলে তিনি মনে করছেন।
## দরিদ্র পড়ুয়াদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা
হাফিজের দাবির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বিনামূল্যে শিক্ষা।
বাংলার বহু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক পড়ুয়ার কাছে উন্নতমানের শিক্ষা বা private coaching-এর সুযোগ থাকে না।
এই পরিস্থিতিতে একটি ভালো সরকারি স্কুল বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারলে বহু পরিবারের সন্তান উপকৃত হতে পারে।
হাফিজের দাবি সেই জায়গাটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
## শিক্ষা পরিকাঠামোর প্রশ্ন ফের সামনে
বাঁকুড়ার এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক সংঘাতের প্রশ্ন নয়, রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামোর অবস্থাকেও সামনে এনেছে।
সরকারি স্কুলগুলির ভবন, শৌচাগার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে।
যদিও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুল পরিকাঠামো উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্কুলে এখনও বিভিন্ন সমস্যার অভিযোগ রয়েছে।
হাফিজের উদ্যোগ সেই বাস্তব সমস্যাগুলিকেই সামনে আনতে চেয়েছিল।
## অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর
হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অভিযোগও উঠেছে। CJP-র পক্ষ থেকে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি আইনি তদন্তই শেষ পর্যন্ত সত্যিটা সামনে আনবে।
## পুলিশের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ
এই ঘটনায় ইতিমধ্যে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে ঘটনার সম্পূর্ণ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
হাফিজ এবং তাঁর পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পরিস্থিতি তুলে ধরার কারণেই তাঁদের উপর হামলা হয়েছিল।
এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
## বাবার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ পরিবার
একদিকে বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে হাফিজের পরিবার।
পরিবারের সদস্যরা একদিকে প্রিয়জনের মৃত্যুর শোক সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে ঘটনার বিচার চাইছেন।
তার মধ্যেই হাফিজের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসছে শিক্ষা এবং দেশের ভবিষ্যতের কথা।
এটাই তাঁর অবস্থানকে আলাদা করে তুলেছে।
## ঠাকুমার অবস্থাও উদ্বেগজনক
হাফিজের ঠাকুমা জাহানারা বেগমও ছেলে হারানোর শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অনেক সময় জ্ঞান হারাচ্ছেন।
তবুও সুস্থ অবস্থায় তিনি পরিবারের জন্য শান্তি এবং সকলের ভালো থাকার কথা বলছেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এতে স্পষ্ট, ঘটনাটি শুধু হাফিজের নয়, গোটা পরিবারকেই গভীরভাবে আঘাত করেছে।
## ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে সামাজিক দাবি
হাফিজের বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল ব্যক্তিগত ক্ষতিকে তিনি একটি সামাজিক দাবিতে পরিণত করতে চাইছেন।
বাবার মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ নেওয়ার পরিবর্তে তিনি চান তাঁর বাবার নামে এমন একটি স্কুল তৈরি হোক, যা বহু মানুষের জীবন বদলাতে পারে।
একজন তরুণের এই দাবি শিক্ষা নিয়ে চলমান বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
## ‘লড়াই শেষ হবে না’
হাফিজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার লড়াই চলবে। তাঁর মতে, এই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলনও থামবে না।
বাবাকে হারানোর পরেও তাঁর বক্তব্যে সেই দৃঢ়তা বজায় রয়েছে।
তিনি চান, তাঁর বাবার মৃত্যু যেন শুধুমাত্র একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে না থাকে। বরং সেই ঘটনা যদি একটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির কারণ হয়, তাহলে তাঁর বাবার স্মৃতি আরও বৃহত্তর অর্থ পাবে।
## রাজ্যের কাছে বড় বার্তা
হাফিজের এই দাবি রাজ্য সরকারের কাছেও একটি প্রতীকী বার্তা। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি শুধু নতুন ভবন তৈরি বা কিছু সরঞ্জাম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশুও শহরের নামী স্কুলের মতো শিক্ষার সুযোগ পেতে পারে।
বিশ্বমানের স্কুলের দাবি সেই আকাঙ্ক্ষাকেই সামনে নিয়ে আসে।
## গ্রামের স্কুল থেকে বৃহত্তর প্রশ্ন
একটি গ্রামের পুরনো স্কুলের বেহাল দশা নিয়ে একজন প্রাক্তন ছাত্র প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল একটি বিতর্ক।
কিন্তু এখন সেই ঘটনা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রশাসনের ভূমিকা এবং সামাজিক দায়িত্ব—একাধিক বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
তাই ঘটনাটি শুধু বাঁকুড়ার স্থানীয় খবর হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
## শিক্ষার অধিকার নিয়ে আলোচনা
ভারতের সংবিধান এবং আইন শিক্ষার অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আর্থিক এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে বহু শিশুর শিক্ষার সুযোগ এখনও সমান নয়।
সরকারি স্কুলগুলি এই বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
হাফিজের বিনামূল্যে বিশ্বমানের স্কুলের দাবি সেই বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্যটির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
## ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্কুল
হাফিজের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সেই স্কুল শুধু তাঁর বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখবে না, বহু প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষার সুযোগ দিতে পারে।
তাই তাঁর দাবি একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিসৌধের পরিবর্তে কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরির দিকে।
এই কারণেই তাঁর বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে এতটা আলোচনায় এসেছে।
## রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে শিক্ষা?
হাফিজ CJP-র সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁর দাবির কেন্দ্রবিন্দু কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়। বরং শিক্ষা।
এমনকি তাঁর বাবার নামে স্কুল তৈরি হলেও তিনি চান সেই স্কুলে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য না থাকুক।
সবার জন্য বিনামূল্যে উন্নত শিক্ষা—এই দাবিই তাঁর বক্তব্যের মূল কথা।
## প্রশাসনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন
এখন দেখার বিষয়, রাজ্য সরকার হাফিজের এই আবেদনে কী প্রতিক্রিয়া জানায়। সরকার তাঁর পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যের পরিবর্তে স্কুল তৈরির প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে তাঁর দাবি যে রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, তা বলাই যায়।
একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
## শেষ কথা
বাঁকুড়ার ইন্দাসের তরুণ শেখ আবদুল হাফিজের গল্প এখন ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নে পৌঁছে গিয়েছে। নিজের পুরনো স্কুলের বেহাল পরিকাঠামো দেখে তা নিয়ে ছবি ও ভিডিও করেছিলেন তিনি। সেই উদ্যোগের পর তাঁর বাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে এবং ছেলেকে রক্ষা করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন তাঁর বাবা শেখ মাফিক। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বাবাকে হারানোর পরও হাফিজের দাবি অন্যরকম। পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্য চান না তিনি। তাঁর আবেদন, সরকার যদি তাঁদের পরিবারের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে, তাহলে বাংলার যে কোনও জায়গায় তাঁর প্রয়াত বাবার নামে একটি বিশ্বমানের স্কুল তৈরি করুক। সেই স্কুলে যেন দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও বিনামূল্যে ভালো শিক্ষা পেতে পারে।
হাফিজের এই দাবি শুধু তাঁর বাবার স্মৃতিকে সম্মান জানানোর ইচ্ছা নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির প্রতি তাঁর অঙ্গীকারেরও প্রকাশ। তিনি জানিয়েছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরাও থামবেন না।
অন্যদিকে, হামলার ঘটনায় ওঠা রাজনৈতিক অভিযোগের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। CJP-র পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হলেও, ঘটনার প্রকৃত দায় কার এবং হামলার পিছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে।
সবশেষে হাফিজের দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁকে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, নাকি তাঁর স্মৃতিতে এমন কিছু তৈরি করা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপকৃত করবে? হাফিজ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছেন। তাঁর বাবার নামে একটি উন্নতমানের স্কুল তৈরির দাবি এখন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।


