গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় বারবার হাসপাতাল বদলের প্রবণতা কমাতে এবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করল পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্যদপ্তর। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, কোনও ক্রিটিক্যাল রোগী হাসপাতালে এলে তাঁকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে হবে। তার পরেই প্রয়োজন হলে অন্য হাসপাতালে রেফার করা যাবে। তবে সেই রেফারও চিকিৎসকের ইচ্ছেমতো করা যাবে না। রোগীকে অন্যত্র পাঠানোর আগে হাসপাতালের ডেপুটি সুপার অথবা সহকারী সুপারকে বিষয়টি জানাতে হবে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল ‘রেফার রোগ’ কমানো এবং গুরুতর অসুস্থ রোগী ও তাঁদের পরিবারের দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব করা। বিশেষ করে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়ার সময় যাতে চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট না হয়, সেদিকেই জোর দেওয়া হয়েছে।
### রেফারের আগে নিশ্চিত করতে হবে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড
নতুন ব্যবস্থায় রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ‘এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়’ বলে রোগীকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না।
রেফারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হাসপাতালের ডেপুটি সুপারকে স্বাস্থ্যভবনের **ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুমের** সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যে হাসপাতালে রোগীকে পাঠানো হচ্ছে, সেখানে প্রয়োজনীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার সুবিধা ও বেড রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার পরই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এগোবে।
তবে রোগীর পরিবার নিজেরাই অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে এই নিয়মের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে বলে স্বাস্থ্যদপ্তরের নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।
### পরিকাঠামো রয়েছে, কিন্তু চালু হয়নি বহু CCU
স্বাস্থ্যদপ্তরের পর্যালোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের পরিকাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও কিছু জায়গায় তা এখনও কার্যকর হয়নি। **Critical Care Management Information System বা CCMIS** পোর্টালে থাকা তথ্য খতিয়ে দেখে এই বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট নিয়ে একটি রাজ্যস্তরের বৈঠক হয়। সেখানে পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে CCU ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর সংশ্লিষ্ট জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
### ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালুর নির্দেশ
যেসব হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের পরিকাঠামো তৈরি হয়ে রয়েছে কিন্তু এখনও চালু হয়নি, সেগুলিকে দ্রুত কার্যকর করার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। **৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে** সংশ্লিষ্ট CCU চালু করে তার তথ্য CCMIS পোর্টালে আপডেট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে বীরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল, ফ্রেজারগঞ্জ হেলথ সেন্টার, চন্দননগর মহকুমা হাসপাতাল, সাগরদিঘি সুপার স্পেশালিটি, কল্যাণী গান্ধী মেমোরিয়াল, বেলদা-ডেবরা ও শালবনি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, আমতলা টিসিইউ এবং মেটিয়াবুরুজ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল।
অর্থাৎ শুধুমাত্র পরিকাঠামো তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ নয়। বাস্তবে রোগী যাতে সেই পরিষেবা পান, তা নিশ্চিত করতেই এবার জোর দেওয়া হচ্ছে।
### হাইব্রিড CCU নিয়েও তৎপরতা
হাইব্রিড ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের ক্ষেত্রেও দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি হাসপাতালে পরিকাঠামো তৈরি হলেও এখনও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি।
এই তালিকায় রয়েছে ফালাকাটা, ওন্দা-পুরুলিয়া ও গোপালপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ, কালনা মহকুমা হাসপাতাল এবং আসানসোল জেলা হাসপাতাল। এগুলিও **৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের হাতে তুলে দেওয়ার** নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
### প্রতি সপ্তাহে CCU পর্যালোচনা
ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটগুলির কাজকর্ম যাতে নিয়মিত নজরদারির মধ্যে থাকে, তার জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে CCU-র পরিকাঠামো, পরিষেবা এবং কার্যকারিতা নিয়ে **প্রতি সপ্তাহে রিভিউ মিটিং** করতে হবে।
এর ফলে কোনও ইউনিটে চিকিৎসক, বেড, যন্ত্রপাতি বা পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করার সুযোগ তৈরি হবে। স্বাস্থ্যদপ্তরের লক্ষ্য, জরুরি মুহূর্তে কোনও রোগী যাতে শুধুমাত্র পরিষেবার ঘাটতির কারণে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের মুখে না পড়েন।
### ICU-তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যোগ্যতাও নির্দিষ্ট
ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসার মান বজায় রাখতেও নির্দিষ্ট যোগ্যতার চিকিৎসক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ICU-তে অন্তত একজন **পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক** থাকতে হবে।
অ্যানাস্থেশিয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের **MD বা DNB in Anaesthesiology** ডিগ্রি থাকা প্রয়োজন। একইভাবে মেডিসিন, পালমোনারি মেডিসিন এবং এমার্জেন্সি মেডিসিনের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও MD অথবা DNB ডিগ্রির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিকিৎসকরাই ICU বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য হবেন।
এর ফলে ক্রিটিক্যাল রোগীদের চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত ও নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
### সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ নজর
ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে দীর্ঘসময় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা চলায় সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে। সেই কারণে CCU-তে **ইনফেকশন কন্ট্রোল স্ট্যাটাস** নিয়মিত পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর।
প্রতিটি হাসপাতালের ইনফেকশন কন্ট্রোল নার্সকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। CCU-র সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত তা নজরে রাখতে হবে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
### রোগী ও পরিবারের দুর্ভোগ কমানোই লক্ষ্য
গুরুতর অসুস্থ রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া পরিবারের কাছে অত্যন্ত চাপের বিষয়। বিশেষ করে অ্যাম্বুল্যান্সে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অন্য হাসপাতালে গিয়ে বেড না পাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের নতুন নির্দেশিকায় তাই রেফারের আগে রোগীকে স্থিতিশীল করা এবং গন্তব্য হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড নিশ্চিত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় বাঁচানো এবং অপ্রয়োজনীয় রেফার কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
### সরকারি হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্যবস্থায় নজর
সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যদপ্তরের এই নির্দেশিকায় তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—**রোগীকে আগে স্থিতিশীল করা, প্রয়োজনীয় CCU পরিষেবা স্থানীয় স্তরেই কার্যকর করা এবং রেফারের আগে বেড নিশ্চিত করা**।
পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যেসব CCU এখনও চালু হয়নি, সেগুলিকে দ্রুত কার্যকর করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়াও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন নজর থাকবে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলি কতটা কার্যকরভাবে চালু করা যায় এবং নতুন রেফারেল ব্যবস্থার ফলে সরকারি হাসপাতালে রোগী ও তাঁদের পরিবারের ভোগান্তি কতটা কমে।


