পশ্চিমবঙ্গের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা বা Dearness Allowance (DA)-র হিসাব তৈরির ক্ষেত্রে এবার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হল। রাজ্যের WBiFMS HRMS পোর্টালে নতুন একটি মডিউল যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের চাকরিজীবনের বেতন সংক্রান্ত পুরনো তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিভুক্ত করা সম্ভব হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে বকেয়া DA-র হিসাব প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
নতুন ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে “Pay Details Entry for Arrear DA”। অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত কোনও সরকারি কর্মীর চাকরিজীবনে বেসিক পে বা মূল বেতনে যতবার পরিবর্তন হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য এবার নির্দিষ্ট মডিউলের মাধ্যমে সিস্টেমে নথিভুক্ত করা যাবে। এই কাজের দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট DDO অথবা HRMS Approver-এর উপর থাকবে।
তবে এই নতুন মডিউল নিয়ে সরকারি কর্মী ও অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। মডিউল চালু হয়েছে মানেই এখনই বকেয়া DA মিটিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে ব্যবস্থাটি উন্নয়ন বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং অর্থদপ্তরের আনুষ্ঠানিক Order বা SOP প্রকাশের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যাবে।
নতুন মডিউলে কীভাবে তথ্য নথিভুক্ত হবে?
WBiFMS HRMS পোর্টালে এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত তথ্য ধাপে ধাপে আপলোড করা যাবে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে wbifms.gov.in ওয়েবসাইটে গিয়ে HRMS Approver হিসেবে সাইন ইন করতে হবে। এরপর বামদিকে থাকা মেনু থেকে ‘Arrear/Supplementary’ বিভাগে যেতে হবে। সেখানেই পাওয়া যাবে ‘Pay details entry for Arrear D(A)’ অপশন।
এই অপশনে গেলে সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের একটি তালিকা দেখা যাবে। সেখানে কর্মীর HRMS ID, নাম, GPF নম্বর, পদ, অবসরের তারিখ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। তালিকা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে চিহ্নিত করে তাঁর Row-তে ক্লিক করলে কর্মীর প্রোফাইলের সঙ্গে Basic Pay Entry টেবিল খুলে যাবে।
এরপর শুরু হবে মূল বেতনের ইতিহাস নথিভুক্ত করার কাজ।বেতন পরিবর্তনের প্রতিটি তথ্য দিতে হবেএকজন সরকারি কর্মীর চাকরিজীবনে একাধিকবার বেতন পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, ROPA সংশোধন কিংবা অন্য কোনও কারণে মূল বেতন পরিবর্তিত হতে পারে। বকেয়া DA-র সঠিক হিসাব তৈরির জন্য এই প্রতিটি পরিবর্তনের তথ্য সিস্টেমে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।
এর জন্য ‘Add Row’ ব্যবহার করে প্রতিটি বেতন পরিবর্তনের তথ্য আলাদাভাবে যোগ করতে হবে। সেখানে Basic Pay পরিবর্তনের কারণ, Notional Date, Actual Date, Service, Group, ROPA, Pay Band, Band Pay এবং Grade Pay-এর মতো বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে। যেখানে প্রযোজ্য, সেখানে NPA, AGP, MSP, Personal Pay এবং Special Pay-এর তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ কোনও কর্মীর চাকরিজীবনে যদি পাঁচবার বেসিক পে পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনগুলির প্রত্যেকটির জন্য আলাদা তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। একবারে শুধুমাত্র বর্তমান বা শেষ বেতন লিখে দিলেই সম্পূর্ণ হিসাব তৈরি হবে না। পুরো চাকরিজীবনের প্রয়োজনীয় বেতন-পরিবর্তনের ইতিহাস সিস্টেমে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও থাকছেবেতন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য এন্ট্রি করার পর তা ভালোভাবে যাচাই করে ‘Save & Continue’ অথবা ‘Save’ অপশনে ক্লিক করতে হবে। এন্ট্রির কাজ শেষ হলে মূল পেজে ফিরে গিয়ে ‘Generate Report’ অপশনের মাধ্যমে রিপোর্ট তৈরি করা যাবে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মীর Scanned Copy of Service Book-এর সঙ্গে ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগও রয়েছে। এর ফলে পুরনো চাকরির রেকর্ড এবং নতুন করে সিস্টেমে দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হতে পারে।
বকেয়া DA-র হিসাবের ক্ষেত্রে বেতন পরিবর্তনের তারিখ এবং পরিমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনও ভুল তথ্য নথিভুক্ত হলে পরবর্তী হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সেই কারণেই এন্ট্রির আগে সংশ্লিষ্ট নথি দেখে তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বকেয়া মহার্ঘ ভাতার হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। তাঁদের ক্ষেত্রে চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্য বেতন এবং DA-র হার অনুযায়ী বকেয়া হিসাব করতে হলে পুরনো বেতন কাঠামোর তথ্য প্রয়োজন।
একজন কর্মীর চাকরিজীবনে একাধিক Pay Revision, ইনক্রিমেন্ট বা বেতন সংশোধন হয়ে থাকলে হিসাব আরও জটিল হতে পারে। সেই তথ্য যদি ডিজিটাল পদ্ধতিতে এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে হিসাব প্রস্তুত করার কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
নতুন WBIFMS মডিউলের গুরুত্ব মূলত এখানেই। পুরনো বেতন সংক্রান্ত তথ্যকে ডিজিটাল কাঠামোয় এনে ভবিষ্যতের বকেয়া DA হিসাবের জন্য একটি প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
এখনই কি বকেয়া DA মিলবে?
এই প্রশ্নটিই বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মডিউল দেখে অনেকের মনে হতে পারে যে বকেয়া DA প্রদানের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থাটি বর্তমানে development বা testing stage-এ রয়েছে। অর্থদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক Order অথবা SOP প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত DDO-দের চূড়ান্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ এখন মূলত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরির কাজ এগোচ্ছে। কোন নিয়মে বকেয়া DA-র হিসাব হবে, কোন সময়সীমা ধরা হবে, কখন এবং কীভাবে অর্থ প্রদান করা হবে—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
সরকারি নির্দেশিকার অপেক্ষাবকেয়া DA সংক্রান্ত কোনও প্রক্রিয়ায় সরকারি Order এবং SOP অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধুমাত্র একটি সফটওয়্যার মডিউল তৈরি হলেই অর্থপ্রদানের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যায় না।
প্রথমে কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং হিসাব প্রস্তুতির ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের এখনই নির্দিষ্ট অর্থপ্রাপ্তির তারিখ ধরে নেওয়া উচিত নয়।অর্থদপ্তরের আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা প্রকাশিত হলে পুরো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় কমতে পারে জটিলতাসরকারি প্রশাসনে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পরিষেবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। WBiFMS-এ বেতন এবং কর্মী সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
বকেয়া DA-র হিসাবের মতো জটিল কাজে ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবহারের ফলে তথ্য খোঁজা, বেতন পরিবর্তনের ইতিহাস দেখা এবং রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জন্যও কর্মীদের তথ্য এক জায়গায় পাওয়া সহজ হতে পারে।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে সঠিক তথ্য আপলোড করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে ভবিষ্যতের হিসাবেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।সামনে কী হতে পারে?
নতুন মডিউল চালু হওয়ার পর এখন নজর থাকবে অর্থদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। সরকারি Order বা SOP প্রকাশিত হলে বকেয়া DA-র হিসাব ও অর্থপ্রদানের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।তখন জানা যাবে কোন কর্মীরা এই প্রক্রিয়ার আওতায় থাকবেন, কোন সময়ের বকেয়া বিবেচনা করা হবে, কীভাবে হিসাব চূড়ান্ত হবে এবং অর্থপ্রদানের প্রশাসনিক পদ্ধতি কী হবে।
এই মুহূর্তে তাই নতুন মডিউলকে বকেয়া DA প্রদানের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে না দেখে হিসাব প্রস্তুতির প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের বকেয়া DA সংক্রান্ত হিসাব তৈরির ক্ষেত্রে WBiFMS HRMS-এ নতুন “Pay Details Entry for Arrear DA” মডিউল যুক্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অগ্রগতি। এর মাধ্যমে কর্মীদের চাকরিজীবনের বেতন পরিবর্তনের বিস্তারিত তথ্য ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা যাবে এবং পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য ব্যবহার করে বকেয়া DA-র হিসাব তৈরির পথ তৈরি হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মডিউল চালু হওয়া মানেই বকেয়া DA প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে যাওয়া নয়। অর্থদপ্তরের আনুষ্ঠানিক Order বা SOP প্রকাশের পরেই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। তাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের এখন সরকারি নির্দেশিকার দিকেই নজর রাখা প্রয়োজন।


