ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত নুন-চিনি, ভাজাভুজি কিংবা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার—আধুনিক জীবনযাত্রায় এগুলি অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যস্ত জীবনে দ্রুত পেট ভরানোর জন্য অনেকেই পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে বেছে নিচ্ছেন এমন খাবার, যাতে ক্যালোরি বেশি হলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি তুলনামূলকভাবে কম। দীর্ঘদিন এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ভারতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। **ICMR-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট রোগের বোঝার প্রায় ৫৬.৪ শতাংশের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের যোগ রয়েছে।** ২০২৪ সালে ICMR-NIN প্রকাশিত Dietary Guidelines for Indians-এও সুষম খাবার, অতিরিক্ত নুন-চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
## খাবারের ভুল অভ্যাস থেকেই শুরু বিপদ
শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালোরি গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি ও নুন খাওয়া, পর্যাপ্ত ফল-সবজি না খাওয়া এবং নিয়মিত processed বা ultra-processed food খাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে বিপদ তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হল, অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতি সাধারণত একদিনে চোখে পড়ে না। বরং বছরের পর বছর ধরে খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব শরীরে জমতে থাকে। ওজন বৃদ্ধি, কোমরের মেদ, রক্তচাপ বা রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনগুলি অনেক সময় প্রথমে তেমন গুরুত্ব পায় না। পরে সেগুলিই বড় ধরনের metabolic বা cardiovascular সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
## ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক ভারতীয় গবেষণাতেও খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার উন্নতির মাধ্যমে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের নতুন ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, অতিরিক্ত ক্যালোরি এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা একসঙ্গে থাকলে ওজন ও metabolic health-এর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত নুন ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
## শুধু মোটা হলেই বিপদ নয়
অনেকের ধারণা, শরীরের ওজন না বাড়লে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। স্থূলতা যেমন metabolic রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি, তেমনই শরীরে অতিরিক্ত চর্বি, রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও cholesterol-এর মতো বিভিন্ন metabolic marker-এর পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
ICMR-INDIAB-এর জাতীয় গবেষণায় obesity-এর বিভিন্ন ধরন এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস, coronary artery disease ও chronic kidney disease-এর মতো সমস্যার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ওজন মাপার মেশিনে কত কেজি দেখাচ্ছে, সেটিই স্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ ছবি নয়।
## শিশু-কিশোরদের খাবার নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও অতিরিক্ত processed food, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ-ক্যালোরির খাবারের প্রবণতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অপুষ্টির পাশাপাশি childhood obesity-ও দ্রুত বাড়ছে। সস্তা processed food, অতিরিক্ত চিনি ও sedentary lifestyle এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন।
শৈশব থেকেই যদি অতিরিক্ত নুন, চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়, তাহলে পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা আরও কঠিন হতে পারে।
## প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে নতুন বিতর্ক
ভারতে packaged food-এর ক্ষেত্রে front-of-pack warning label নিয়েও বর্তমানে বিতর্ক চলছে। FSSAI-এর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি added sugar, salt বা saturated fat থাকলে প্যাকেটের সামনে লাল সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত নিয়মে অন্তত দু’টি পুষ্টি-উপাদান নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলেই সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও সংগঠনগুলির আপত্তি রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, কোনও পণ্যে শুধু চিনি বা শুধু নুনের মাত্রা বেশি হলেও সেটি সতর্কতার আওতায় নাও আসতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও আইনি বিতর্ক চলছে।
এই বিতর্ক থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—কী খাচ্ছেন, তা জানার অধিকার এবং খাবারের পুষ্টিগত তথ্য বোঝার ক্ষমতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।
## ICMR-এর পরামর্শ কী?
ICMR-NIN-এর Dietary Guidelines for Indians 2024-এ সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ultra-processed food-এর নিয়মিত ও অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো, খাবারের লেবেল পড়ে উপাদান সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে জীবনে কখনও ফাস্ট ফুড বা মিষ্টি খাওয়া যাবে না। মূল বিষয় হল **কতটা, কত ঘন ঘন এবং কী ধরনের খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ হচ্ছে**।
## প্লেটেই বদল আনতে হবে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, প্রয়োজনীয় protein এবং উপযুক্ত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর fat-এর জায়গা থাকা উচিত। অন্যদিকে অতিরিক্ত নুন, চিনি, ভাজাভুজি এবং highly processed খাবারকে নিয়মিত খাদ্যের বদলে সীমিত রাখা জরুরি।
একই সঙ্গে শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং sedentary lifestyle কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
## স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই কঠিন ডায়েট নয়
স্বাস্থ্যকর থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর বা দামি diet অনুসরণ করা প্রয়োজন নেই। বাড়ির সাধারণ খাবার দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব। ভাত বা রুটি, ডাল, শাকসবজি, মাছ, ডিম, দই, ফল—পরিমাণ ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলির ভারসাম্য বজায় রাখাই মূল কথা।
অন্যদিকে কোনও একটি খাবারকে সম্পূর্ণ ‘বিষ’ বা ‘মারণ’ বলে চিহ্নিত করার বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়াই বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি যুক্তিযুক্ত।
## সচেতনতাই বড় প্রতিরোধ
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব অনেক সময় নীরবে শরীরে জমতে থাকে। তাই রোগ দেখা দেওয়ার পর খাদ্যাভ্যাস বদলানোর পরিবর্তে আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে পরিবারে শিশুদের খাবারের অভ্যাস তৈরি করার সময় বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে যখন অসংক্রামক রোগের বোঝা বাড়ছে, তখন খাদ্যাভ্যাসকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। গবেষণা ও সরকারি খাদ্যনির্দেশিকার বার্তাও একই—**সুষম খাবার, পরিমিতি এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি।**


