গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড়সড় আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে আমেরিকা, যার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য কৌশলগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরেই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। তবে একইসঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে প্রস্তাবিত চুক্তি তাদের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। চুক্তিটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত এবং কার্যকর হয়নি।
শুক্রবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি স্থায়ী ক্ষমতা পাবে। ট্রাম্প এটিকে ‘Infinite Life’ অর্থাৎ কার্যত মেয়াদহীন চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান হবে।
ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে, সেনা মোতায়েন করতে অথবা সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারবে না, যদি না ওয়াশিংটনের লিখিত অনুমোদন থাকে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চিনের সম্ভাব্য কৌশলগত উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে মার্কিন প্রশাসন। নতুন চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে সেই সম্ভাব্য উপস্থিতি রুখে দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উপযুক্ত এলাকাগুলিতে বড় আকারের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তৈরির প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করা হবে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে পিটুফিক স্পেস বেস রয়েছে, যা আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যবস্থায় সেই সামরিক উপস্থিতি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ কথাটির অর্থ গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়া নয়। এখানেই বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ডেনমার্ক এখনও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত থাকবে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনও চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তি গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা, ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা জোটের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তার অবস্থানও চুক্তিতে স্বীকৃতি পেয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
চুক্তিটি অবশ্য এখনও চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ ট্রাম্প ঘোষণা করলেও বাস্তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য আরও কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ বাকি রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই তিনি বারবার এই আর্কটিক ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্বের কথা বলেছেন। অতীতে তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার ইচ্ছার কথাও প্রকাশ করেছেন। সেই অবস্থানকে কেন্দ্র করে ডেনমার্ক ও অন্যান্য ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। এবারকার চুক্তি সেই আগের মালিকানা বা অধিগ্রহণের দাবির তুলনায় ভিন্ন পথে এগোচ্ছে—সার্বভৌমত্ব বদল না করে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানই এই বিতর্কের অন্যতম কারণ। উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত এই বিশাল দ্বীপটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী কৌশলগত এলাকায় রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চিনের ক্রমবর্ধমান কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ডের সামরিক ও নিরাপত্তাগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাই ওয়াশিংটন সেখানে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংবেদনশীল বিনিয়োগের বিষয়টি। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কোনও বিনিয়োগ যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও নতুন ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ থাকবে। বিশেষ করে চিন ও রাশিয়ার মতো ন্যাটোর বাইরের শক্তিগুলির সামরিক বা কৌশলগত উপস্থিতি রুখে দেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর বিস্তারিত কাঠামো এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে এখনও কিছু বিষয় স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বক্তব্য থেকে আপাতত এটুকু পরিষ্কার যে তাঁরা সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণায় ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি থাকলেও বাস্তবে এটি গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা হস্তান্তরের চুক্তি নয়।
সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের মার্কিন-ডেনমার্ক টানাপোড়েনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড জোর দিয়েছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের উপর। চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত ও সংসদীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই এর বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা আরও স্পষ্ট হবে।


