কলকাতা ফুটবল লিগের ২০২৬ মরশুমের চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই পৌঁছে গিয়েছে একেবারে শেষ দিনে। এবারের কলকাতা লিগে এমন টানটান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে শেষ রাউন্ডের ফলাফলই নির্ধারণ করবে কার হাতে উঠবে ট্রফি। শুধু কলকাতার দুই প্রধান মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল নয়, মহামেডান স্পোর্টিং, ভবানীপুর এবং ইউনাইটেড স্পোর্টসও এখনও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অঙ্কে রয়েছে। অর্থাৎ শেষ দিনে মোট পাঁচটি দলের সামনে লিগ জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ডের শেষ দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হতে চলেছে মোহনবাগান বনাম মহামেডান স্পোর্টিংয়ের লড়াই। বারাসত স্টেডিয়ামে শনিবার মুখোমুখি হবে দুই দল। এই ম্যাচের ফলাফল সরাসরি চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে। মোহনবাগান যদি ম্যাচটি জেতে, তাহলে তাদের ট্রফি জয়ের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। অন্যদিকে মহামেডানকে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে এই ম্যাচে জয় পাওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কলকাতা ফুটবলের দুই ঐতিহ্যশালী দলের এই লড়াই কার্যত চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আবহ তৈরি করেছে।
মোহনবাগানের সামনে অবশ্য শুধু জয়ের সমীকরণই নেই। তারা ম্যাচ ড্র করেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তাদের অন্য ম্যাচগুলির ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। শেষ ম্যাচে ইউনাইটেড স্পোর্টসের বিরুদ্ধে আটকে যাওয়ার পর সবুজ-মেরুন শিবিরের উপর চাপ কিছুটা বেড়েছে। দলের অধিনায়ক শুভাশিস বসু অবশ্য অন্য দলের ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি জয় নিয়েই মাঠে নামতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শনিবারের ম্যাচকে তাঁরা ফাইনাল হিসেবেই দেখছেন।
মোহনবাগানের জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ হল জাতীয় দলের শিবিরে চলে যাওয়া কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের অনুপস্থিতি। আপুইয়া, অভিষেক সিং এবং মেহতাব সিং জাতীয় শিবিরে যোগ দেওয়ায় চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না। তবুও দলের লক্ষ্য বদলাচ্ছে না। প্রথমবার কলকাতা লিগের চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ডে খেলতে নেমে ট্রফি জয়ের জন্য সরাসরি জয়কেই পাখির চোখ করছে মোহনবাগান।
অন্যদিকে মহামেডান স্পোর্টিংও এই ম্যাচকে ঘিরে আত্মবিশ্বাসী। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল পায়নি তারা। ফলে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার লক্ষ্য সাদা-কালো শিবিরের। কোচ শাহিদ রামনও দলকে নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের কাছে সমীকরণ তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার—চ্যাম্পিয়ন হতে হলে মোহনবাগানকে হারাতেই হবে। তাই বারাসতের ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই তুঙ্গে।
শিরোপার দৌড়ে রয়েছে ইস্টবেঙ্গলও। গত মরশুমে কলকাতা লিগের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল লাল-হলুদ। এবারও টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি জয়ের সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। তবে ইস্টবেঙ্গলের সমীকরণ অন্য দুই প্রধানের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। মোহনবাগান ও মহামেডানের ম্যাচ ড্র করতে হবে, ইস্টবেঙ্গলকে নিজেদের শেষ ম্যাচে কোল ইন্ডিয়াকে বড় ব্যবধানে হারাতে হবে এবং ভবানীপুর-ইউনাইটেড ম্যাচও ড্র হতে হবে—তবেই লাল-হলুদ শিবিরের সামনে ট্রফি জয়ের রাস্তা খুলবে।
ইস্টবেঙ্গল কোচ অর্চিষ্মান বিশ্বাস অবশ্য অন্য দলের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে চাইছেন না। তাঁর লক্ষ্য নিজেদের ম্যাচ ভালোভাবে শেষ করা। সুপার সিক্স পর্বে চোট এবং অন্যান্য কারণে দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডারকে পাওয়া যায়নি। ডার্বিতে চোট পাওয়া ফরোয়ার্ড মনতোষ মাঝিও সুপার সিক্সে খেলতে পারেননি। চাকু মন্ডি ও অঙ্কন ভট্টাচার্যও অন্য দায়িত্বে দলের বাইরে ছিলেন। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও শেষ ম্যাচে জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে ইস্টবেঙ্গল।
তবে তিন প্রধানের বাইরে ভবানীপুরও এবারের কলকাতা লিগে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকার পর চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ডে মহামেডানের কাছে হারলেও পরের ম্যাচে কোল ইন্ডিয়াকে তিন গোলে হারিয়ে আবারও শিরোপার দৌড়ে ফিরে এসেছে তারা। ফলে শেষ ম্যাচে ইউনাইটেড স্পোর্টসকে হারাতে পারলে এবং মোহনবাগান-মহামেডান ম্যাচ ড্র হলে ভবানীপুরের সামনে ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভবানীপুর কোচ রঞ্জন চৌধুরিও অন্য ম্যাচের ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের ম্যাচ জেতার লক্ষ্য জানিয়েছেন। দলের কয়েকজন ফুটবলার চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ডের আগে বিভিন্ন কারণে বাইরে চলে গেলেও শেষ ম্যাচের জন্য দল প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। ইউনাইটেড স্পোর্টসের বিরুদ্ধে ম্যাচ তাই ভবানীপুরের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচ দলের তালিকায় রয়েছে ইউনাইটেড স্পোর্টসও। তবে তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অঙ্ক সবচেয়ে কঠিন। একাধিক ম্যাচের নির্দিষ্ট ফলাফল একসঙ্গে মিলে গেলেই তাদের সামনে ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে অন্য দলগুলির ফলাফলের উপর তাদের নির্ভরতা বেশি। তবুও ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনও সম্ভাবনাই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এবারের কলকাতা লিগের সুপার সিক্স পর্বে মোট ছয়টি দল খেলেছে। ‘এ’ গ্রুপ থেকে কোল ইন্ডিয়া, ইউনাইটেড স্পোর্টস ও মহামেডান এবং ‘বি’ গ্রুপ থেকে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও ভবানীপুর যোগ্যতা অর্জন করেছিল। চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ডে গ্রুপ পর্বের পয়েন্ট যোগ হয়নি; দুই গ্রুপের দলগুলি একে অপরের বিরুদ্ধে খেলেছে। এই ব্যবস্থার ফলে শেষ দিনে এসে একাধিক দলের সামনে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শনিবার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচই একই সময়ে, বিকেল ৩টেয় শুরু হওয়ার কথা। মোহনবাগান-মহামেডান ম্যাচ বারাসত স্টেডিয়ামে, ইস্টবেঙ্গল-কোল ইন্ডিয়া ম্যাচ এবং ভবানীপুর-ইউনাইটেড ম্যাচও একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে একই সময়ে মাঠে থাকা তিন ম্যাচের ফলাফল মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত জানা যাবে ২০২৬ সালের কলকাতা লিগের চ্যাম্পিয়ন কে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা লিগের শেষ দিন এবারের মরশুমকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। তিন প্রধানের সঙ্গে ভবানীপুর ও ইউনাইটেড স্পোর্টস—মোট পাঁচ দল এখনও অঙ্কের বিচারে ট্রফির লড়াইয়ে রয়েছে। মোহনবাগান-মহামেডানের সরাসরি লড়াই যেমন চ্যাম্পিয়নশিপের কেন্দ্রবিন্দু, তেমনই অন্য দুই ম্যাচের ফলাফলও পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে। তাই শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কলকাতা লিগের চ্যাম্পিয়নশিপের উত্তেজনা বজায় থাকছে।


