বাঁকুড়ায় ফের ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনা। পরপর দুটি বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল তিন তরুণের। গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দু’জন। শনিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে বাঁকুড়ার জয়পুর থানার সলদা গ্রামে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের অনুমান, প্রবল গতিতে বাইক চালানোর কারণেই হয়তো এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ সলদা গ্রামের রাস্তায় আচমকাই বিকট শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়রা ছুটে গিয়ে দেখেন, রাস্তার উপর দু’টি বাইক দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে রয়েছে। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছেন পাঁচজন যুবক। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর জখম অবস্থায় রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাই দ্রুত উদ্ধারকাজে হাত লাগান এবং পুলিশকে খবর দেন।
## মুখোমুখি সংঘর্ষে ছিটকে পড়েন পাঁচজন
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই রাতে দুটি বাইক দ্রুতগতিতে একই রাস্তা দিয়ে চলছিল। একটি বাইকে ছিলেন তিনজন, অন্য বাইকে ছিলেন দু’জন। কোনও কারণে দুটি বাইকের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে পাঁচজন আরোহীই বাইক থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান।
দুটি বাইকের অবস্থাও দুর্ঘটনার ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিচ্ছিল। সংঘর্ষের পর বাইক দু’টি কার্যত দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বিকট শব্দ শুনে আশপাশের মানুষজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পাঁচ যুবককে পড়ে থাকতে দেখে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
## হাসপাতালে নিয়ে যেতেই তিনজনকে মৃত ঘোষণা
স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় আহত পাঁচজনকেই দ্রুত বিষ্ণুপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তিনজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতদের পরিচয় রাতেই জানা যায়। তাঁরা হলেন জয়পুরের বৈতল গ্রামের বাসিন্দা পল্লব সাঁতরা, সুপুর মেটে পাড়ার বাসিন্দা অনন্ত সাঁতরা এবং উজ্জ্বল বায়েন।
মৃত তিন তরুণের প্রত্যেকের বয়স ১৯ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ জীবনের একেবারে শুরুতেই মর্মান্তিকভাবে শেষ হয়ে গেল তাঁদের পথচলা। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মৃতদের পরিবার ও পরিচিতদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
## আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আরও দু’জন
দুর্ঘটনায় আহত বাকি দু’জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। রবিবার সকাল পর্যন্ত তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল সূত্রে তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর রাতেই দুর্ঘটনাস্থল এবং হাসপাতালে পৌঁছয় জয়পুর থানার পুলিশ। দুর্ঘটনাগ্রস্ত দুটি বাইক উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত জোরে দুটি বাইক চলছিল, চালকদের গতি কতটা ছিল এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে মুখোমুখি সংঘর্ষ হল—সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
## অতিরিক্ত গতি কি দুর্ঘটনার কারণ?
প্রাথমিক তদন্তে প্রবল গতিতে বাইক চালানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশের অনুমান, দুটি বাইকের গতি বেশি থাকার কারণেই হয়তো চালকরা শেষ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং সংঘর্ষ এড়াতে পারেননি। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কোনও কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরা হচ্ছে না।
রাস্তায় বাইক চালানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গতি যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, এই দুর্ঘটনা ফের সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে একই বাইকে একাধিক যাত্রী থাকলে ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। যদিও এই নির্দিষ্ট দুর্ঘটনায় সেই বিষয়গুলির কোনওটি প্রত্যক্ষভাবে দায়ী কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
## পরিবারে শোক, এলাকায় উদ্বেগ
একসঙ্গে তিন তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় জয়পুরের সংশ্লিষ্ট এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, রাস্তায় দ্রুতগতির যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা রুখতে আরও নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতের দিকে বেপরোয়া বাইক চালানো বন্ধ করতে পুলিশের নিয়মিত নজরদারি এবং সচেতনতা অভিযান জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, পুলিশ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাইক দু’টি পরীক্ষা করছে। সংঘর্ষের ধরন, রাস্তার পরিস্থিতি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে ঠিক কী কারণে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
এক রাতের দুর্ঘটনায় তিনটি তরতাজা প্রাণ চলে যাওয়ার ঘটনায় ফের প্রশ্ন উঠছে পথ নিরাপত্তা নিয়ে। কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতা বা অতিরিক্ত গতি কীভাবে একটি পরিবারের সারাজীবনের শোকের কারণ হয়ে উঠতে পারে, বাঁকুড়ার এই দুর্ঘটনা তারই মর্মান্তিক উদাহরণ।


