সঙ্গীর খোঁজে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল আফ্রিকার তিন বন্য কুকুর। জঙ্গলের পরিচিত এলাকা ছেড়ে নতুন সঙ্গী এবং নতুন বসতি খুঁজতে তারা প্রায় ৪ হাজার ১২৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। এই অসাধারণ যাত্রাকে আফ্রিকার কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীর নথিভুক্ত দীর্ঘতম বিচরণ বা ‘ডিসপার্সাল’ বলে মনে করছেন গবেষকরা। ঘটনাটি সামনে আসতেই বন্যপ্রাণীপ্রেমী এবং বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, তিনটি আফ্রিকান বন্য কুকুরই ছিল ভাই। জাম্বিয়ার কাফু ন্যাশনাল পার্ক থেকে তারা যাত্রা শুরু করে। প্রায় আট থেকে নয় মাস ধরে চলা এই সফরে কুকুরগুলি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশাপাশি মানুষের বসতি, রাস্তা, নদী, পাহাড়ি এলাকা এবং অপেক্ষাকৃত অনিরাপদ অঞ্চলের মধ্য দিয়েও এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা জাম্বিয়ার লুয়াংওয়া ভ্যালির দিকে পৌঁছয়। পুরো যাত্রাপথে তাদের চলাফেরা নজরে রাখতে জিপিএস কলার ব্যবহার করেছিলেন গবেষকরা।
আফ্রিকান বন্য কুকুর বা ‘আফ্রিকান পেইন্টেড ডগ’ সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। তাদের বৈজ্ঞানিক নাম *Lycaon pictus*। একটি দলে সাধারণত একাধিক পূর্ণবয়স্ক প্রাণী এবং শাবক থাকে। দলের মধ্যে সাধারণত প্রভাবশালী পুরুষ ও স্ত্রী কুকুরই প্রজনন করে। ফলে দলের অপেক্ষাকৃত কমবয়সি সদস্যদের অনেক সময় নতুন এলাকা এবং সঙ্গীর সন্ধানে দল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই জীববিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিসপার্সাল’ বলা হয়।
গবেষণায় জানা গিয়েছে, তিন ভাইয়ের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তারা কাফু ন্যাশনাল পার্কের নিজেদের দল থেকে বেরিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে যায়। যাত্রাপথে কখনও তারা সংরক্ষিত এলাকায় থেকেছে, আবার কখনও মানুষের বসতির কাছাকাছি দিয়ে চলেছে। বড় রাস্তা পার হওয়া, নদী অতিক্রম করা এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল পেরোনোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাদের। তবুও দীর্ঘ সময় ধরে তারা এগিয়ে গিয়েছে নতুন জায়গা এবং সঙ্গীর সন্ধানে।
তিন ভাইয়ের এই যাত্রার মোট দূরত্ব ছিল প্রায় ৪ হাজার ১২৬ কিলোমিটার। গবেষকদের মতে, আফ্রিকার কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ বিচরণের নজির আগে নথিভুক্ত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে প্রচলিত অর্থে ঋতুভিত্তিক ‘মাইগ্রেশন’ বলছেন না। কারণ, মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে প্রাণীরা সাধারণত নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায় এবং পরে আবার আগের এলাকায় ফিরে আসে। কিন্তু এই তিন বন্য কুকুরের যাত্রা ছিল নতুন এলাকা ও প্রজননের সুযোগ খোঁজার উদ্দেশ্যে একমুখী বিচরণ।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ঘটনা আফ্রিকার বন্য কুকুরদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এতদিন মনে করা হত, আবাসস্থল ভাগ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন বন্য কুকুরের দল একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রা দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে তারা এখনও বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে অন্য দলের কাছে পৌঁছতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের বন্য কুকুরের জনসংখ্যার মধ্যে প্রাকৃতিক যোগাযোগ বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই যোগাযোগ বন্য কুকুরদের বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই দলের মধ্যে দীর্ঘদিন প্রজনন চলতে থাকলে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে। অন্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন সঙ্গীর সন্ধান জিনগত বৈচিত্র্য বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ টিকে থাকার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষকদের মতে, এই তিন ভাইয়ের যাত্রা শুধু একটি প্রাণীর অসাধারণ ভ্রমণের গল্প নয়, বরং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করছে।
তবে যাত্রাটি মোটেই নিরাপদ ছিল না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের বিচরণে বেরিয়ে পড়া বন্য কুকুরদের অনেকেই পথের মধ্যে মারা যায়। শিকারিদের পাতা তারের ফাঁদ বা ‘ওয়্যার স্নেয়ার’ তাদের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। বুশমিট বা বন্যপ্রাণীর মাংস সংগ্রহের জন্য পাতা এই ফাঁদে আটকে বহু প্রাণীর মৃত্যু হয়। একটি স্ত্রী বন্য কুকুর জাম্বিয়া থেকে মোজাম্বিকের দিকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর এমনই একটি ফাঁদে মারা যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও বন্য কুকুরদের সামনে থাকে আরও নানা বিপদ। সিংহ বা অন্য শিকারি প্রাণীর আক্রমণ, কুমিরে ভরা নদী, দ্রুতগতির গাড়ি, মানুষের বসতি এবং খাদ্যের অভাব—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে তাদের চলতে হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে বেরিয়ে পড়লে বিপদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, এই প্রাণীরা সংরক্ষিত এলাকায় অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে চলাফেরা করলেও, মানুষের বসতি বা অনিরাপদ অঞ্চলে ঢুকলে দ্রুত এবং সোজা পথে এগিয়ে যায়। এতে তারা দ্রুত বিপজ্জনক এলাকা পেরিয়ে যেতে পারে।
আফ্রিকান বন্য কুকুর বর্তমানে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে। বন্য পরিবেশে তাদের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৬০০ পূর্ণবয়স্ক প্রাণী ও বয়ঃসন্ধিকালীন সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের প্রায় ৩৯টি পৃথক জনসংখ্যা রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, রোগ, শিকার কমে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে সংঘাত এবং তারের ফাঁদের কারণে তাদের অস্তিত্ব ক্রমশ সংকটে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের জন্য প্রাকৃতিক করিডর বা সংযোগপথ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। একটি বনাঞ্চল থেকে অন্য বনাঞ্চলে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে বন্য কুকুরদের নতুন সঙ্গী খোঁজা এবং নতুন দল গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে। গবেষকদের মতে, শুধু জাতীয় উদ্যান বা সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করলেই হবে না। সেই সব এলাকার মধ্যে থাকা সংযোগপথ, নদী, তৃণভূমি এবং বাফার জোনগুলিকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
জাম্বিয়ার বন্যপ্রাণী গবেষণা সংস্থাগুলি জিপিএস কলারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বন্য কুকুরেরা মানুষের তৈরি নানা বাধা অতিক্রম করেও বিস্তীর্ণ এলাকায় চলাচল করতে সক্ষম। তবে তাদের এই ক্ষমতার উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে যে বিপদ তৈরি হচ্ছে, তা কমাতে কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিন ভাইয়ের ৪ হাজার ১২৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা তাই একদিকে যেমন প্রকৃতির বিস্ময়, তেমনই অন্যদিকে সতর্কবার্তাও। সঙ্গীর খোঁজে তাদের এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করেছে, বন্যপ্রাণীরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কতটা দূর যেতে পারে। একই সঙ্গে এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে, প্রাণীদের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। তাই আফ্রিকার বন্য কুকুরদের রক্ষা করতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক করিডর সুরক্ষিত রাখার উপরই জোর দিচ্ছেন গবেষকরা।


